দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) হস্তান্তরের প্রস্তাবের প্রতিবাদে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বন্দর শ্রমিকদের নেতৃত্বাধীন সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
গতকাল শনিবার শহরের এক হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের সভাপতি হুমায়ুন কবির এবং সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খোকন জানান, আগামী মঙ্গলবার বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত মানববন্ধন এবং ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টায় ফকিরহাট থেকে ওয়ান স্টপ এলাকা পর্যন্ত মিছিল করবে সংগঠনটি। এনসিটি চুক্তির প্রস্তাবের প্রতিবাদ করায় ১৫ জন বন্দর কর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, বন্দরের শূন্যপদে নিয়োগ এবং বিদেশি অপারেটরের কাছে টার্মিনাল হস্তান্তরের সব কার্যক্রম বন্ধের দাবিও জানায় পরিষদ।
ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি সরকার বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং কোনো বিদেশি কোম্পানিকে এনসিটি বা চট্টগ্রাম বন্দরের অন্য কোনো স্থাপনা পরিচালনার সুযোগ দেবে না। ’ এনসিটিতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই : পরিষদের সভাপতি হুমায়ুন কবির বলেন, ২০০৮ সাল থেকে এনসিটি পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি এরই মধ্যে আধুনিক কনটেইনার-হ্যান্ডেলিং সরঞ্জামে সজ্জিত।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিচালন পরিস্থিতিতে এনসিটিতে কোনো বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। কোনো বিদেশি কোম্পানির কাছে এটি হস্তান্তরের মানে হলো, এমন একটি সম্পদ দিয়ে দেওয়া যা এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব তৈরি করছে। ’ হুমায়ুন কবির দাবি করেন, এনসিটি থেকে বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়। বিদেশি অপারেটর আনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আজ থেকে পাঁচ বছর পর ডিপি ওয়ার্ল্ড যে পরিমাণ কনটেইনার হ্যান্ডেল করার প্রস্তাব দিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে তার চেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডেল করছে।
টার্মিনালের বিদ্যমান অবকাঠামো ও পরিচালন ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ব্যবস্থাপনা কোনো বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার তেমন কোনো যৌক্তিকতা নেই। চাকরি নিয়ে শ্রমিকদের উদ্বেগ : হুমায়ুন কবির বলেন, প্রস্তাবিত এই চুক্তির কারণে ডক শ্রমিক, মার্চেন্ট শ্রমিক এবং এনসিটিতে কর্মরত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রায় এক হাজার কর্মীসহ বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা গত দুই বছর ধরে চেষ্টা করে একজন খালাসিও নিয়োগ দিতে পারিনি। ’ নিয়োগ বন্ধ থাকার এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী এক বছরের মধ্যে বন্দরের বেশ কয়েকটি বিভাগ পরিচালনগত সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
এই কর্মসংস্থানের ভিত্তি ধরে রাখা এবং তা সম্প্রসারণের জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এ ছাড়া ১৫ জন বন্দর কর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান ইব্রাহিম খোকন। এনসিটি ইস্যুতে বিক্ষোভে জড়িত কর্মীদের বিরুদ্ধে এর আগে ব্যবস্থা নিয়েছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিদেশি প্রভাবের বিষয়ে সতর্কতা : ইব্রাহিম খোকন দাবি করেন, টার্মিনালটি বিদেশিদের দ্বারা পরিচালিত হলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের ওপর বিদেশি প্রভাব বাড়বে, পুঁজি পাচার হবে এবং কর্মসংস্থান হারাবে।
তিনি বলেন, ‘দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে চট্টগ্রাম বন্দরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, যা অর্থনীতি ও সাপ্লাই চেইনকে ব্যাহত করবে। ’ এনসিটিতে পরিচালন সরঞ্জামের প্রাপ্যতা আন্তর্জাতিক মানের নিচে বা প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তারও সমালোচনা করেন ইব্রাহিম খোকন।
তিনি এই দাবিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে বলেন, বন্দরের নথিপত্র, সরঞ্জাম কেনার রেকর্ড এবং মেরিটাইম লজিস্টিক বিশেষজ্ঞদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই দাবির সত্যতা মেলে না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের হয়ে বন্দরের ভেতরে যে কোম্পানিটি জরিপ চালিয়েছে, তার ৭৫ শতাংশ কর্মীই ভারতীয় নাগরিক। এনসিটি চুক্তি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত : এনসিটি প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ের কথা উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, এর আগে একটি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশকে অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে টার্মিনালটি নির্মাণ ও পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছিল।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকারও এনসিটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। সরকার এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক গোষ্ঠীগুলো এই প্রস্তাবিত ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে। এই প্রক্রিয়ার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে করা একটি আবেদন খারিজ করে দিয়ে গত মার্চে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এনসিটির জন্য বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তি করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আইনি পথ পরিষ্কার করে দেন।





















