5:17 am, Monday, 9 November 2026

বাংলাদেশে পারিবারিক নৃশংসতা ও সহিংসতা চরমে

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বাংলাদেশে পারিবারিক নৃশংসতা ও সহিংসতার ঘটনা চরম উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। এই সংবেদনশীল ও জটিল বিষয় নিয়ে মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, সামাজিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক সংকট এবং নৈতিকতার অভাবের কারণে পরিবারে খুনোখুনি ও মারাত্মক নির্যাতনের মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে।

তীব্র মানসিক চাপ, হতাশা ও আত্মসম্মানবোধের অভাব মানুষকে হিংস্র আচরণ করতে বাধ্য করে। যখন একজন ব্যক্তি বাইরের সমাজ বা কর্মক্ষেত্রে তার ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে না, তখন সেটির বহিঃপ্রকাশ ঘটে নিজের পরিবারের দুর্বল সদস্যদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নৃশংসতা চালানের মাধ্যমে। আর এসব নৃশংসতার ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।

চারপাশে সংঘটিত এ ধরনের সহিংসতা, খুনের মতো নেতিবাচক খবর দেখলে শিশুর কোমল মনে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মতো যেকোনো পরিস্থিতি বা খবর যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে না, ফলে এই ধরনের খবর তাদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত কওে; বিশেষ করে পারিবারিক নৃশংসতা তাদের মানসিক অবস্থাকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ফলে আজকের যে শিশুকে আমরা আগামীকালের ভবিষ্যৎ বলে থাকি, জীবন গড়ার শুরুতেই তাদের এ ধরনের ট্রমা নিয়ে বড় হতে হয়। সন্তানের হাতে বাবা খুন, বাবার হাতে সন্তান-মা খুন, পরিবারের এক সদস্যের হাতে আরেকজন খুন, বিষ খাইয়ে হত্যা— এসব ঘটনার ট্রমায় শিশুরা নিজের মা-বাবা বা পরিবারের সব সদস্যকেই সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানী ড. আলবার্ট তার বিখ্যাত ‘সোশ্যাল লার্নিং থিওরি’ এবং ‘ববো ডল’ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, শিশুরা চারপাশের পরিবেশ ও গণমাধ্যম থেকে আচরণ শেখে।

শিশুরা মূলত অনুকরণের মাধ্যমে শেখে। যখন তারা টিভি বা ইন্টারনেটে প্রতিনিয়ত খুন, মারামারি বা সহিংসতার দৃশ্য দেখে, তখন তারা অবচেতনভাবেই ধরে নেয় যে এটিই পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম বা কোনো সমস্যা সমাধানের উপায়। ফলে তাদের আচরণেও আগ্রাসী ও খিটখিটে ভাব প্রকাশ পেতে শুরু করে। মনোরোগ ও শিশু মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোহিত কামাল বলেন, নেতিবাচক সংবাদ বা দৃশ্য শিশুদের মানসিক নিরাপত্তাহীনতা তীব্রভাবে বাড়িয়ে দেয়।

দুর্ঘটনা, খুন বা লাশের ছবি ও খবর বা ঘটনা শিশুদের মনে তীব্র ট্রমা বা মানসিক আঘাত তৈরি করে। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মতো একটি দুর্ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখার ক্ষমতা শিশুদের থাকে না। ফলে তারা ভাবে, বাইরে গেলেই বুঝি এমন ঘটবে, অথবা তার মা-বাবাও বুঝি এভাবেই মারা যাবেন, অথবা মা-বাবা বা অন্য কারো হাতে তাদেরও এমন মৃত্যু হতে পারে।

এই অমূলক ভয় থেকে শিশুদের মনে তীব্র প্যানিক অ্যাটাক, ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে। শিশু মনোরোগ বিশ্লেষকেরা বলেন, এসব ঘটনার কারণে শিশুরা মনে করতে শুরু করেছে যে তাদের চারপাশ অনিরাপদ। আবার অনেক সময় শিশুরা টিভিতে বা গণমাধ্যমে দেখা সহিংসতা নিজের অজান্তেই অনুকরণের চেষ্টা করে। এতে তাদের আচরণে খিটখিটে ভাব, রাগ এবং আগ্রাসী মনোভাব দেখা দিতে পারে।

এসব খবরে শিশুর মনে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ তৈরি হয়। এটি পরে বিষণ্নতায় রূপ নিতে পারে, যা তাদের পড়াশোনা এবং স্বাভাবিক সামাজিক মেলামেশায় ব্যাঘাত ঘটায়। এসব ভয়ানক দৃশ্য বা খবর দেখার পর শিশুরা রাতে ঘুমাতে ভয় পায়। তারা মাঝরাতে আঁতকে উঠতে পারে এবং নিয়মিত দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এমনকি, প্রতিনিয়ত খুন বা সহিংসতার খবর দেখতে দেখতে একপর্যায়ে শিশুরা এসব বিষয়ে সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে।

তখন অন্যের কষ্ট বা মৃত্যুর প্রতি তাদের মনে কোনো সহানুভূতি বা আবেগ কাজ করে না। শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপিকা রাইমা সুলতানা বলেন, ঘরের ভেতরের সহিংসতার সবচেয়ে নীরব ও ক্ষতিগ্রস্ত দর্শক হলো শিশু। শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ, মনোযোগের ঘাটতি বা আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা দিতে পারে। শৈশবের এই সহিংসতার অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে মানসিক ও আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক, গবেষক ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব পারিবারিক ও সামাজিক নৃশংসতা বৃদ্ধির পেছনে নৈতিক এবং ধর্মীয় অনুশাসনের অভাবকে দায়ী করেন। তার মতে, পারিবারিক নৃশংসতার মৌলিক কারণ হলো— রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভীতিহীন বা নৈতিকতাহীন শিক্ষা ও শাসনব্যবস্থা এবং মানুষের মনগড়া জীবনযাপন।

এর থেকে পরিত্রাণের জন্য ধর্মীয় অনুশাসন বৃদ্ধি করা এবং পারিবারিক ও সামাজিক শাসন জোরদার করা আবশ্যিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল ও কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের গবেষক এবং কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট মোহাম্মদ সেলিম চৌধুরী বলেন, সহিংসতা একটি শিশুর মানসিকতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সহিংসতা প্রত্যক্ষ করা শিশু বড় হয়ে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

অনেক ক্ষেত্রে সে অন্যের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ঝগড়াঝাঁটি করে, যা তার সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও সামাজিক অপরাধ বিশ্লেষক ড. মুহাম্মদ নুর হোসাইন বলেন, সহিংসতা হলো মূলত হিংসাযুক্ত বিকৃত আচরণ। যখন পরিবারের এক সদস্য কর্তৃক অপর সদস্য অত্যাচার, অবিচার ও নির্যাতনের শিকার হয়, তখন পারিবারিক বন্ধন ভেঙে পড়ে।

বর্তমান সমাজে পারস্পরিক সহনশীলতার অভাব এবং পরমতসহিষ্ণুতা না থাকার কারণে সামান্য পারিবারিক কলহও শেষ পর্যন্ত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের সামগ্রিক মতামত অনুযায়ী, পারিবারিক নৃশংসতা কোনো একক কারণে ঘটে না। এটি মূলত মানসিক বিকৃতি, মাদকাসক্তি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সুশিক্ষার অভাবের একটি পুঞ্জীভূত ফল।

শুধু কঠোর আইন দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা প্রদান, মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে কঠোর পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং যেকোনো মানসিক সমস্যায় অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হওয়া। দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতার শিকার নারীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অনিদ্রা ও আত্মমর্যাদাবোধ কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

তবে এর পেছনে একমাত্র কারণ পারিবারিক সহিংসতা নয়; এর সঙ্গে ব্যক্তির আর্থসামাজিক অবস্থা ও মানসিক চাপও জড়িত। আইনবিদ ব্যারিস্টার সায়েদ মুনিম বলেন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নির্যাতনের শিকার একজন নারীকে আইনি পদক্ষেপ নিতে গেলে পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির চাপ, সন্তানদের নিরাপত্তা, থাকার জায়গা এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয়।

ফলে শুধু অভিযোগ করার পরামর্শ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না; বরং আশ্রয়, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং নিরাপত্তা, পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। থানায় মামলা হওয়ার আগেই অনেক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। সামাজিক নীরবতার এই চক্র ভাঙতে জরুরি সেবা যেমন— জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, নারী ও শিশু সহায়তা ১০৯ এবং শিশু সুরক্ষা হটলাইন ১০৯৮-এর কার্যকর ব্যবহার প্রয়োজন।

একই সঙ্গে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) এবং সেলগুলোর সেবা আরও সহজলভ্য ও বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের একটি বড় সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

গোপনে বিয়ে করেছেন নিহা, কাবাঘরে জীবনসঙ্গীকে নিয়ে প্রকাশ করলেন অভিনেত্রী

বাংলাদেশে পারিবারিক নৃশংসতা ও সহিংসতা চরমে

Update Time : 12:38:42 am, Monday, 21 September 2026

বাংলাদেশে পারিবারিক নৃশংসতা ও সহিংসতার ঘটনা চরম উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। এই সংবেদনশীল ও জটিল বিষয় নিয়ে মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, সামাজিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক সংকট এবং নৈতিকতার অভাবের কারণে পরিবারে খুনোখুনি ও মারাত্মক নির্যাতনের মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে।

তীব্র মানসিক চাপ, হতাশা ও আত্মসম্মানবোধের অভাব মানুষকে হিংস্র আচরণ করতে বাধ্য করে। যখন একজন ব্যক্তি বাইরের সমাজ বা কর্মক্ষেত্রে তার ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে না, তখন সেটির বহিঃপ্রকাশ ঘটে নিজের পরিবারের দুর্বল সদস্যদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নৃশংসতা চালানের মাধ্যমে। আর এসব নৃশংসতার ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।

চারপাশে সংঘটিত এ ধরনের সহিংসতা, খুনের মতো নেতিবাচক খবর দেখলে শিশুর কোমল মনে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মতো যেকোনো পরিস্থিতি বা খবর যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে না, ফলে এই ধরনের খবর তাদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত কওে; বিশেষ করে পারিবারিক নৃশংসতা তাদের মানসিক অবস্থাকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ফলে আজকের যে শিশুকে আমরা আগামীকালের ভবিষ্যৎ বলে থাকি, জীবন গড়ার শুরুতেই তাদের এ ধরনের ট্রমা নিয়ে বড় হতে হয়। সন্তানের হাতে বাবা খুন, বাবার হাতে সন্তান-মা খুন, পরিবারের এক সদস্যের হাতে আরেকজন খুন, বিষ খাইয়ে হত্যা— এসব ঘটনার ট্রমায় শিশুরা নিজের মা-বাবা বা পরিবারের সব সদস্যকেই সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানী ড. আলবার্ট তার বিখ্যাত ‘সোশ্যাল লার্নিং থিওরি’ এবং ‘ববো ডল’ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, শিশুরা চারপাশের পরিবেশ ও গণমাধ্যম থেকে আচরণ শেখে।

শিশুরা মূলত অনুকরণের মাধ্যমে শেখে। যখন তারা টিভি বা ইন্টারনেটে প্রতিনিয়ত খুন, মারামারি বা সহিংসতার দৃশ্য দেখে, তখন তারা অবচেতনভাবেই ধরে নেয় যে এটিই পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম বা কোনো সমস্যা সমাধানের উপায়। ফলে তাদের আচরণেও আগ্রাসী ও খিটখিটে ভাব প্রকাশ পেতে শুরু করে। মনোরোগ ও শিশু মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোহিত কামাল বলেন, নেতিবাচক সংবাদ বা দৃশ্য শিশুদের মানসিক নিরাপত্তাহীনতা তীব্রভাবে বাড়িয়ে দেয়।

দুর্ঘটনা, খুন বা লাশের ছবি ও খবর বা ঘটনা শিশুদের মনে তীব্র ট্রমা বা মানসিক আঘাত তৈরি করে। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মতো একটি দুর্ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখার ক্ষমতা শিশুদের থাকে না। ফলে তারা ভাবে, বাইরে গেলেই বুঝি এমন ঘটবে, অথবা তার মা-বাবাও বুঝি এভাবেই মারা যাবেন, অথবা মা-বাবা বা অন্য কারো হাতে তাদেরও এমন মৃত্যু হতে পারে।

এই অমূলক ভয় থেকে শিশুদের মনে তীব্র প্যানিক অ্যাটাক, ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে। শিশু মনোরোগ বিশ্লেষকেরা বলেন, এসব ঘটনার কারণে শিশুরা মনে করতে শুরু করেছে যে তাদের চারপাশ অনিরাপদ। আবার অনেক সময় শিশুরা টিভিতে বা গণমাধ্যমে দেখা সহিংসতা নিজের অজান্তেই অনুকরণের চেষ্টা করে। এতে তাদের আচরণে খিটখিটে ভাব, রাগ এবং আগ্রাসী মনোভাব দেখা দিতে পারে।

এসব খবরে শিশুর মনে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ তৈরি হয়। এটি পরে বিষণ্নতায় রূপ নিতে পারে, যা তাদের পড়াশোনা এবং স্বাভাবিক সামাজিক মেলামেশায় ব্যাঘাত ঘটায়। এসব ভয়ানক দৃশ্য বা খবর দেখার পর শিশুরা রাতে ঘুমাতে ভয় পায়। তারা মাঝরাতে আঁতকে উঠতে পারে এবং নিয়মিত দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এমনকি, প্রতিনিয়ত খুন বা সহিংসতার খবর দেখতে দেখতে একপর্যায়ে শিশুরা এসব বিষয়ে সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে।

তখন অন্যের কষ্ট বা মৃত্যুর প্রতি তাদের মনে কোনো সহানুভূতি বা আবেগ কাজ করে না। শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপিকা রাইমা সুলতানা বলেন, ঘরের ভেতরের সহিংসতার সবচেয়ে নীরব ও ক্ষতিগ্রস্ত দর্শক হলো শিশু। শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ, মনোযোগের ঘাটতি বা আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা দিতে পারে। শৈশবের এই সহিংসতার অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে মানসিক ও আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক, গবেষক ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব পারিবারিক ও সামাজিক নৃশংসতা বৃদ্ধির পেছনে নৈতিক এবং ধর্মীয় অনুশাসনের অভাবকে দায়ী করেন। তার মতে, পারিবারিক নৃশংসতার মৌলিক কারণ হলো— রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভীতিহীন বা নৈতিকতাহীন শিক্ষা ও শাসনব্যবস্থা এবং মানুষের মনগড়া জীবনযাপন।

এর থেকে পরিত্রাণের জন্য ধর্মীয় অনুশাসন বৃদ্ধি করা এবং পারিবারিক ও সামাজিক শাসন জোরদার করা আবশ্যিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল ও কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের গবেষক এবং কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট মোহাম্মদ সেলিম চৌধুরী বলেন, সহিংসতা একটি শিশুর মানসিকতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সহিংসতা প্রত্যক্ষ করা শিশু বড় হয়ে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

অনেক ক্ষেত্রে সে অন্যের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ঝগড়াঝাঁটি করে, যা তার সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও সামাজিক অপরাধ বিশ্লেষক ড. মুহাম্মদ নুর হোসাইন বলেন, সহিংসতা হলো মূলত হিংসাযুক্ত বিকৃত আচরণ। যখন পরিবারের এক সদস্য কর্তৃক অপর সদস্য অত্যাচার, অবিচার ও নির্যাতনের শিকার হয়, তখন পারিবারিক বন্ধন ভেঙে পড়ে।

বর্তমান সমাজে পারস্পরিক সহনশীলতার অভাব এবং পরমতসহিষ্ণুতা না থাকার কারণে সামান্য পারিবারিক কলহও শেষ পর্যন্ত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের সামগ্রিক মতামত অনুযায়ী, পারিবারিক নৃশংসতা কোনো একক কারণে ঘটে না। এটি মূলত মানসিক বিকৃতি, মাদকাসক্তি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সুশিক্ষার অভাবের একটি পুঞ্জীভূত ফল।

শুধু কঠোর আইন দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা প্রদান, মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে কঠোর পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং যেকোনো মানসিক সমস্যায় অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হওয়া। দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতার শিকার নারীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অনিদ্রা ও আত্মমর্যাদাবোধ কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

তবে এর পেছনে একমাত্র কারণ পারিবারিক সহিংসতা নয়; এর সঙ্গে ব্যক্তির আর্থসামাজিক অবস্থা ও মানসিক চাপও জড়িত। আইনবিদ ব্যারিস্টার সায়েদ মুনিম বলেন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নির্যাতনের শিকার একজন নারীকে আইনি পদক্ষেপ নিতে গেলে পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির চাপ, সন্তানদের নিরাপত্তা, থাকার জায়গা এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয়।

ফলে শুধু অভিযোগ করার পরামর্শ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না; বরং আশ্রয়, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং নিরাপত্তা, পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। থানায় মামলা হওয়ার আগেই অনেক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। সামাজিক নীরবতার এই চক্র ভাঙতে জরুরি সেবা যেমন— জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, নারী ও শিশু সহায়তা ১০৯ এবং শিশু সুরক্ষা হটলাইন ১০৯৮-এর কার্যকর ব্যবহার প্রয়োজন।

একই সঙ্গে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) এবং সেলগুলোর সেবা আরও সহজলভ্য ও বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের একটি বড় সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।