ব্যাংকার মা স্মিতা সরকার এবং ব্যবসায়ী রজত সরকারের একমাত্র ছেলে রাজেশ সরকার। সন্তান জন্মের সময় মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ করেই রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা স্মিতাকে ব্যাংকের চাকরিতে যোগ দিতে হয়।
বরাবরের মতো রজতকেও ব্যবসার কাজে ছুটতে হয় এখানে-সেখানে। কর্মস্থলে থাকাকালীন সময়টায় শিশুকে রাখার জন্য প্রথমে রজতের মা এসে থাকেন কিছুদিন। নগরজীবনে হাঁপিয়ে উঠলে স্মিতা তার গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন দূরসম্পর্কের এক চাচাতো বোনকে। স্বামী-স্ত্রী কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে চলে গেলে ছোট্ট রাজেশের বেড়ে ওঠা সেই বোনের কাছেই। নিজে একটু স্বস্তিতে থাকার জন্য রাজেশের কাছে তুলে দেন স্মার্টফোন।
মাত্র ১১ মাস বয়স থেকেই ইউটিউবে ভিডিও দেখে খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে ওঠে শিশু রজতের। আজ ৩ বছরে পা রাখলেও অভ্যাসে আসেনি একচুল পরিবর্তন। বরং দিন দিন বেড়েই চলছে স্মার্টফোনে ভিডিও আসক্তি। বিকেলে এক ঘণ্টার জন্য ছাদে যাওয়া ছাড়া ১১শ স্কয়ারফিটের ছোট্ট ফ্ল্যাটে অনলাইনে বন্দিজীবনই যেন নিয়তি তার। তবে চাকরিজীবী না হয়েও মেয়েকে খাবার খাওয়ানোর জন্য ইউটিউবের কার্টুনের শরণাপন্ন হন রুম্পা আক্তার।
এর ফল যে কতটা ভয়াবহ, তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন মেয়ে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। স্কুলে ভর্তি করলে ক্লাসে যেটুকু সময় থাকে সেটুকু সময় বন্ধুদের সঙ্গে মেতে থাকলেও ঘরে ফিরেই বাবার ডেস্কটপে কার্টুনে মগ্ন। যা এখন আসক্তি পর্যায়ে চলে গেছে জানিয়ে রুম্পা আক্তার বলেন, মেয়েকে এখন বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইলেও ডেস্কটপ ছেড়ে উঠতে চায় না। দিন দিন বাড়ছে স্থূলতা।
মাঝে মাঝে মনে হয়, বুদ্ধির বিকাশও বুঝি হচ্ছে না স্বাভাবিক। সব দোষ আমাদেরই। শুধু স্মিতা বা রুম্পা নন। এমন আক্ষেপ এখনকার সময়ের প্রায় সব বাবা-মায়েরই। ডিজিটাল সময়ের সুফলের সঙ্গে শিশুদের শৈশব বন্দি হয়ে যাচ্ছে অনলাইনে। নেই প্রয়োজনীয় খেলার মাঠও। যাতে করে হতে পারে এসব শিশুর খেলা-ধুলার সুযোগ। আর এর সুযোগে ঘটছে বিভিন্ন অপকর্ম। ঘটছে প্রাণহানির মতো ঘটনাও।
কুমিল্লার ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। কেউ বলছেন, মোবাইল ফোনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিই তাকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়েছে। আবার কেউ বলছেন, ইন্টারনেটে টিকটকে আসক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে তার মৃত্যুর কারণ। যে বয়সে ধুলোবালিতে মিশে খেলা করার কথা সে বয়সে নিজের চেয়ে বয়সে বড় বন্ধুর সঙ্গে মিলে একের পর এক টিকটক ভিডিও এখন আলোচনায়।
তবে এর জন্য অপ্রতিমের চেয়ে পুরো সিস্টেমকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। সারা দেশে শিশুদের জন্য নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ। ফলে বেড়ে ওঠা শিশুদের বাড়ছে ইন্টারনেট আসক্তি। একসময় শিশুর শৈশব মানেই ছিল মাঠে দৌড়ঝাঁপ, বিকেলের খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, গল্পের বই কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। এখন সেই দৃশ্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ঘরের এক কোণে বসে থাকা শিশু, হাতে স্মার্টফোন— কখনো ভিডিও, কখনো গেম, কখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
বাইরে পৃথিবী থাকলেও তার মন পড়ে থাকে ছোট্ট একটি পর্দায়। এভাবেই প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে অনেক শিশুর শৈশব ক্রমেই ‘অনলাইনে বন্দি’ হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে ঘরে ইন্টারনেট সুবিধার বিস্তারও দ্রুত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের এমআইসিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭২.১ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
ফলে শিশুদের ডিজিটাল জগতে প্রবেশের সুযোগও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুকে ব্যস্ত রাখতে স্মার্টফোন হাতে তুলে দেওয়া এখন অনেক পরিবারের স্বাভাবিক অভ্যাস। খাওয়ানোর সময় ভিডিও, কান্না থামাতে কার্টুন, পড়তে বসানোর আগে গেম— ধীরে ধীরে মোবাইল হয়ে উঠছে শিশুর বিনোদন ও মনোযোগ ধরে রাখার প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু সমস্যা শুধু কতক্ষণ শিশু স্ক্রিনের সামনে থাকছে তা নয়।
সে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কী ধরনের ডিজিটাল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের চাইল্ডহুড ইন এ ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের অনলাইন সময় ও কার্যক্রমের সঙ্গে ডিজিটাল দক্ষতার ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি নিজেই ক্ষতিকর নয়, বরং শিশুর বয়স, অনলাইন কার্যক্রম, কনটেন্ট ও ব্যবহারের ধরন নির্ধারণ করে প্রযুক্তির প্রভাব।
একই সঙ্গে অনলাইন অভিজ্ঞতা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়। শুধু বিনোদন নয়, ঢুকছে ঝুঁকিও : দেশে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে ইউনিসেফের পূর্ববর্তী গবেষণায় ১০-১৭ বছর বয়সী ১,২৮১ জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুকে নিয়ে জরিপ করা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করেছে।
৬৩ শতাংশ শিশু নিজের কক্ষকে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রধান স্থান হিসেবে জানিয়েছিল— যাকে গবেষণায় ‘বেডরুম কালচার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আরও উদ্বেগজনক বিষয়, ওই গবেষণায় ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করার কথা জানিয়েছিল। কিছু শিশু অনলাইনে পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি দেখা করার কথাও জানিয়েছিল।
অর্থাৎ একটি শিশুর হাতে থাকা স্মার্টফোন শুধু কার্টুন বা গেমের দরজা খুলছে না; অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সাইবার বুলিং, প্রতারণা, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং যৌন হয়রানির ঝুঁকিও তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন চাপ : ২০২৫ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশ-জিআইইউ-রিপোর্ট প্ল্যাটফর্মে প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণের অংশগ্রহণে পরিচালিত এক জরিপে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অভিজ্ঞতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি তিনজনের প্রায় দুজন ভুয়া খবর ও ভুল তথ্যকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে বড় চাপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আরও প্রায় এক-সপ্তমাংশ বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্য এবং একই অনুপাতে ক্ষতিকর বা উদ্বেগজনক কনটেন্টকে প্রধান চাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এখানে শিশুর সমস্যাটি শুধু ‘বেশি মোবাইল ব্যবহার’ নয়। সে এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশে বেড়ে উঠছে, যেখানে তথ্যের সঙ্গে ভুল তথ্য, বন্ধুত্বের সঙ্গে হয়রানি এবং বিনোদনের সঙ্গে ক্ষতিকর কনটেন্টও একই পর্দায় হাজির হচ্ছে।
মাঠের বদলে ভার্চুয়াল জগৎ : মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শিশুর বিকাশে খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও বাস্তব জগতের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ অনেক শিশুর অবসর এখন ঘরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার বদলে অনলাইন চ্যাট, মাঠে খেলার বদলে অনলাইন গেম, বই পড়ার বদলে শর্ট ভিডিও— শৈশবের অভিজ্ঞতার জায়গা বদলে যাচ্ছে।
তবে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে দেওয়াও সমাধান নয়। ইউনিসেফের বিশ্লেষণ বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভিডিও গেমস ও ভিডিও দেখার মতো অনলাইন কার্যক্রম কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তি থেকে শিশুকে বিচ্ছিন্ন করা নয়, বরং নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল জীবন নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে মনে করেন, শিশু ঘরেই তো আছে। কিন্তু বাস্তবে শিশুটি ঘরের ভেতর থেকেও এমন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, যাদের পরিচয় বা উদ্দেশ্য পরিবার জানে না। অভিভাবকদের সঙ্গে শিশুদের খোলামেলা যোগাযোগ, বয়সোপযোগী অ্যাপ নির্বাচন, প্রাইভেসি সেটিং, প্যারেন্টিং টুলসের ব্যবহার এবং অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত করতে হবে।
পাশাপাশি অনলাইন সময়ের সঙ্গে অফলাইন খেলাধুলা ও পারিবারিক সময়ের ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তি শিশুদের ভবিষ্যতের দরজা খুলতে পারে— আবার ভুল ব্যবহারে সেই দরজাই তাদের বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। তাই প্রশ্নটা শুধু ‘শিশু কত ঘণ্টা অনলাইনে থাকে’— এতটুকু নয়।
প্রশ্ন হলো, সেই সময়টুকুতে সে কী শিখছে, কী দেখছে, কার সঙ্গে কথা বলছে এবং অনলাইন জগতের কারণে বাস্তব জীবনে কী হারাচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. রাশেদা কে চৌধূরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শিশুর হাতে স্মার্টফোন থাকবে, ইন্টারনেট থাকবে— এটাই বর্তমান বাস্তবতা। কিন্তু সেই পর্দার আড়ালে যেন হারিয়ে না যায় মাঠের খেলাধুলা, বন্ধুত্ব, বই, পরিবার, প্রকৃতি আর স্বাভাবিক শৈশব।
প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে উঠুক নতুন প্রজন্ম, কিন্তু প্রযুক্তির ভেতর যেন বন্দি না হয়ে যায় তাদের শৈশব। তিনি বলেন, ২০২০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় জানানো হয়, বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ শিশু শরীরচর্চার পেছনে দৈনিক এক ঘণ্টা সময়ও ব্যয় করে না। অর্থাৎ প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন শিশু শরীরচর্চার পেছনে সময় ব্যয় করে না। শারীরিক অনুশীলনের অভাবে শিশুর স্বাস্থ্য তো বটেই, মস্তিষ্কের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামাজিক দক্ষতা।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত মাত্রায় মোবাইল বা অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহারের কারণে শিশুরা হারাচ্ছে চিন্তাশক্তি। একই সঙ্গে নিজের মতের সঙ্গে মিল না হওয়ার কারণে খুব দ্রুতই উত্তেজিত আত্মহত্যার মতো ভাবনাও আসছে তাদের মাঝে। ঘটছে নানান সন্ত্রাসী কার্যক্রমও।





















