রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর গত ছয় মাসে সরকারকে নিয়ে অনলাইন মাধ্যমে নানা ধরনের অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই নেতিবাচক। এই ধরনের অপতথ্য ছড়ানো চক্র খোদ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েও নানা ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে।
পাশাপাশি বিএনপি সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী এবং সংসদ সদস্যদের ঘিরে গত ছয় মাসে অন্তত ২৬২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশই নেতিবাচক। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত এসব অপতথ্য শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে অনলাইন ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বলছে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে অপতথ্যের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তাকে ঘিরে মোট ১৫৭টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার প্রায় ৭৮ শতাংশই ছিল নেতিবাচক। অপতথ্যগুলোর ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব কনটেন্ট তৈরিতে একাধিক প্রচলিত ও নতুন কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। রিউমার স্ক্যানারের তথ্য বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রথম ১৮০ দিনে সরকারকে জড়িয়ে বিভিন্ন অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে।
এ সময়ে সরকার ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিষয়কে কেন্দ্র করে মোট ৪৬৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশই ছিল সরকারের বিপক্ষে বা নেতিবাচক বার্তা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রচারিত। এসব অপতথ্যের সিংহভাগেই সরকার, এর নেতৃত্ব ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জড়িয়ে সবচেয়ে বেশি ৩৪টি অপতথ্য এসেছে সার্কাজম পেজের পোস্টের মাধ্যমে।
এর পরেই রয়েছে তার নামে ছড়ানো ভুয়া বক্তব্য (৩০টি) এবং গণমাধ্যমকে নকল করে প্রচারিত ভুয়া ফটোকার্ড (২২টি)। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত ১৯টি কনটেন্টও শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া পুরোনো ছবি-ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে সাতটি ক্ষেত্রে এবং সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করা হয়েছে পাঁচটি অপতথ্যে।
অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু সম্পূর্ণ বানোয়াট তথ্য নয়; বরং ভুয়া বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি ফটোকার্ড, পুরোনো কনটেন্ট পুনর্ব্যবহার, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট এবং এআইনির্ভর কনটেন্টসহ এমন বিভিন্ন কৌশলের সমন্বিত ব্যবহার দেখা গেছে। রিউমার স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তাকে ঘিরে শনাক্ত ৪৮টি অপতথ্যের সব ছিল নেতিবাচক। এরপর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে ঘিরে ৩৩টি এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে ২৬টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া সংসদের স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ঘিরে ২৩টি, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীকে ঘিরে ১৬টি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ঘিরে ১৫টি, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসকে ঘিরে ১৪টি এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে ঘিরে ১৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরকে ঘিরে ১১টি, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ঘিরে ৮টি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে ঘিরে ৭টি অপতথ্য পাওয়া গেছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে ঘিরে ৬টি, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে ঘিরে ৫টি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ঘিরে ৪টি এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকিকে ঘিরে ৩টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (যুব কর্মসংস্থানবিষয়ক) সাইয়েদ বিন আব্দুল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) রাশেদ খান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে ঘিরে দুটি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী জহির উদ্দীন স্বপন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিনকে ঘিরে একটি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
সরকারে থাকা বিএনপির নারী নেত্রীদের ঘিরেও গত ছয় মাসে অপতথ্যের প্রবাহ দেখা গেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদকে ঘিরে চারটি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী আফরোজা খানম রিতাকে ঘিরে একটি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। সরকারের ১৮০ দিনে বিএনপির সংসদ সদস্যদের ঘিরেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের লক্ষ্য ছিলেন সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। তাকে ঘিরে ১৬টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া লুৎফুজ্জামান বাবরকে ঘিরে ৫টি, মানসুরা আলমকে ঘিরে ৩টি এবং বরকতউল্লা বুলু, মনিরুল হক চৌধুরী, শাহাদাত হোসেন সেলিম ও নিলোফার চৌধুরী মনিকে ঘিরে দুটি করে অপতথ্য পাওয়া গেছে।
জয়নুল আবদিন ফারুক, ড. মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মাহবুব উদ্দিন খোকন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, শফিকুর রহমান কিরণ, তাহসিনা রুশদীর লুনা, সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর, সানজিদা ইসলাম তুলি, জীবা আমিনা খান, শওকত আরা আক্তার (ঊর্মি) এবং আন্দালিব রহমান পার্থকে ঘিরে একটি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।


















