বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নের একটি বড় অংশ মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও অনলাইনভিত্তিক সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও ওই ইউনিয়নের বহু এলাকায় এখনো মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছায়নি।
বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকলেও কিছু এলাকায় সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বৃহৎ এ ইউনিয়নে নেই স্থায়ী ডিজিটাল সেন্টার ও ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব কার্যালয়। ফলে জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাড়ি দিতে হয় অন্য ইউনিয়ন কিংবা উপজেলা সদরে। স্থানীয় বাসিন্দা ক্রাইংতপ ম্রো ও মাইকেল ত্রিপুরা বলেন, মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় জরুরি মুহূর্তে ফোনে যোগাযোগ করাও কঠিন।
ইন্টারনেটের অভাবে জন্মনিবন্ধন, চেয়ারম্যানের সনদ, সরকারি ভাতার আবেদনসহ বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক সেবাও মিলছে না। জানা গেছে, দুর্গম এলাকা থেকে সদরের দূরত্ব ৭০-৮০ কিলোমিটার। পাহাড়ি দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এত দূরে যেতে সময়ের পাশাপাশি কয়েকগুণ বেশি খরচও হয়। দুর্গম সড়কের কারণে যানবাহনের ভাড়াও বেশি। ইউপি সদস্য লেংক্লাং ম্রো ও কাম্পুক ম্রো বলেন, এ ইউনিয়নে স্থায়ী অবকাঠামো না থাকায় সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধার অভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবাও চালু করা যাচ্ছে না। নাগরিক সেবার পাশাপাশি শিক্ষা ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে রয়েছে আরেক চরম সংকট। ইউনিয়নে নেই কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দূরের এলাকায় যেতে হয়। দারিদ্র্য ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের গ-ি পেরোতে পারে না।
প্রধান শিক্ষক আবু শামা বলেন, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানদের দূরের বিদ্যালয়ে রেখে পড়াশোনা করানো সম্ভব হয় না। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর আর নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত এ জনপদের লোকজন।
ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবা খাতেও। দুর্গম এলাকার মানুষ জরুরি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বা চিকিৎসকের পরামর্শ সহজে নিতে পারে না। গুরুতর অসুস্থ হলে রোগীকে গাড়িতে কিংবা কখনো হেঁটে সদর বা অন্য এলাকায় নিয়ে যেতে হয়। মাঝে মাঝে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে জরুরি চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারান। স্থানীয় বাসিন্দা কাংপে ম্রো বলেন, দ্রুত কুরুকপাতা ইউনিয়নে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা চালুর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
পাশাপাশি নাগরিক সেবার জন্য পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন, বিদ্যুৎ সুবিধা ও নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয় নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। ইউপি চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কার্যক্রম ও সরকারি সুযোগ সুবিধা পরিচালনার নানা সমস্যা হচ্ছে। বর্তমানে আলীকদম সদর ইউনিয়ন এলাকায় ভাড়া করা কার্যালয় থেকে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
নিজস্ব কার্যালয় না থাকায় পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষকে সেবা দিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্গম এ ইউনিয়নে মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও স্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
















