বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভারসাম্য। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো একটি শিবিরের সঙ্গে নিজেকে পুরোপুরি জড়িয়ে না ফেলে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে আসছে ঢাকা।
ফলে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের প্রশ্নটি নিছক একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তির বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা নীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ কারণে এই বিষয়ে আবেগ নয়, প্রয়োজন সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দূরদর্শিতা। সরকার মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাকে সরাসরি নাকচ না করে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা বলেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর বিরুদ্ধে বড় ধরনের আপত্তি এখনো দৃশ্যমান নয়। মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে এমন উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের আগ্রহ থাকতেই পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর অর্থনৈতিক ও জনসম্পৃক্ত সম্পর্ক, তুরস্কের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা, সবই বিবেচনায় রাখার মতো বিষয়।
কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি, সামরিক জোটে যোগ দেওয়া আর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এক কথা নয়। কোনো দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এক বিষয়, আর এমন একটি কাঠামোর অংশ হওয়া, যার সদস্যদের ওপর আক্রমণ হলে পারস্পরিক নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির প্রশ্ন উঠতে পারে, সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। জোটের কোনো সদস্য ভবিষ্যতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, এই প্রশ্নের উত্তর অস্পষ্ট রেখে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষ করে পাকিস্তানের উপস্থিতি বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘ বৈরিতা, কাশ্মীর প্রশ্ন এবং দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের ইতিহাস দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত ভাগ করে নেয়। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য, নদী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তাসহ বহুমাত্রিক সম্পর্ক।
ফলে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে কোনো সামরিক কাঠামোয় বাংলাদেশের প্রবেশকে ভারত কীভাবে দেখবে, সেটি বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই বিবেচ্য। এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধান ও পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলেও বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণœ রাখতে হবে।
জোটের সিদ্ধান্ত যেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষমতাকে সীমিত না করে। বন্ধুত্বের পরিধি বাড়ানো ভালো, কিন্তু সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা সংকুচিত করে নয়। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত হবে এ বিষয়ে তাড়াহুড়ো না করা। প্রথমে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কাঠামো, সম্ভাব্য বাধ্যবাধকতা, অর্থনৈতিক প্রভাব, সামরিক ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে গভীর পর্যালোচনা করা।
প্রয়োজন হলে সংসদীয় আলোচনা এবং জাতীয় পর্যায়ে মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে। কারণ এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যার প্রভাব একটি সরকারের মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর প্রতিফলন পড়তে পারে বাংলাদেশের আগামী কয়েক দশকের নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে। তাই মক্কা প্যাক্ট নিয়ে বাংলাদেশের আবেগনির্ভর কিংবা কোনো চাপের কাছে নতিস্বীকার করে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না; বরং তা হতে হবে শর্ত, স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির নির্মোহ হিসাবের ভিত্তিতে।
আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে, এই জোট যেমন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে ঠিকই, কিন্তু তার বিনিময়ে যেন দেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণœ না হয়। বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চায়, সংঘাত নয়। সহযোগিতা চায়, পরনির্ভরতা নয়। মক্কা প্যাক্টে যাওয়ার আগে তাই ঢাকাকে নিশ্চিত করতে হবে, জোটের অংশীদার হলেও বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি যেন বাংলাদেশের হাতেই থাকে।
















