10:50 am, Sunday, 30 August 2026

শিল্পকে আইনের খাঁচায় বন্দি করা যায় না

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

শিল্প ও সংস্কৃতির জগৎ স্বভাবতই মুক্ত, বহুমাত্রিক ও সৃজনশীল। মানুষের অনুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ, আনন্দ, বেদনা, স্বপ্ন ও সংকট, জীবনের এই বিচিত্র অভিজ্ঞতাই যুগে যুগে সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রধান উপাদান হয়ে উঠেছে।

তাই কোনো নির্দিষ্ট শিল্পধারা বা বিষয়কে সামাজিক অবক্ষয়ের একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তা নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। সম্প্রতি প্রেম ও রোমান্সনির্ভর সিনেমা ও নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের দাবিতে একজন আইনজীবীর আইনি নোটিশ সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। নোটিশে তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, পড়াশোনায় অনীহা এবং সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির জন্য প্রেম ও রোমান্সভিত্তিক কনটেন্টকে দায়ী করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দেশপ্রেমমূলক কনটেন্টকে বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে। উদ্দেশ্য যদি হয় সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, সেটি নিঃসন্দেহে আলোচনার যোগ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ যদি হয় শিল্পের বিষয়বৈচিত্র্যকে আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা, তাহলে তা শুধু শিল্পের স্বাধীনতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না; বরং একটি মুক্ত ও সৃজনশীল সমাজের চরিত্র নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে।

কারণ শিল্পকে নির্দেশ দিয়ে ভালো করা যায় না, রুচিকে ফরমান দিয়ে উন্নত করা যায় না এবং মানুষের অনুভূতিকে আইনের খাঁচায় বন্দি করেও সুস্থ সংস্কৃতি নির্মাণ সম্ভব নয়। সাংস্কৃতিক বিকাশ আদালতের রুলিং দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী কেবল প্রেম ও রোমান্সনির্ভর সিনেমা এবং নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের দাবিতে সরকারকে একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।

নোটিশদাতার দাবি, এসব কনটেন্টের কারণে যুবসমাজ পড়ালেখা ছেড়ে ধ্বংস হচ্ছে এবং পরকীয়া ও সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। এর প্রতিকার হিসেবে তিনি ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দেশপ্রেমের কনটেন্ট বাধ্যতামূলক করার আইনি ফরমান চেয়েছেন। প্রথম দেখায় একে খুব ‘নৈতিক ও কল্যাণকামী’ মনে হলেও, গভীর বিশ্লেষণে এই দাবি কেবল অযৌক্তিকই নয়; বরং মুক্তবুদ্ধি ও শৈল্পিক স্বাধীনতার জন্য এক ভয়ংকর লাল সংকেত।

প্রথমত, প্রেম-ভালোবাসা ও মানবিক অনুভূতি মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে শুরু করে কালজয়ী সাহিত্য, নাটক এবং সিনেমার মূল রসদ জুগিয়েছে মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক মনস্তত্ত্ব ও সম্পর্কের টানাপোড়েন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্র, জহির রায়হান থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদÑআমাদের কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তিই ছিল মানবিক সম্পর্কের এই জটিল ও সুন্দর বন্ধন।

এখন কি তবে আইনি নোটিশ দিয়ে সাহিত্যের এই হাজার বছরের ধারাকে খারিজ করে দেওয়া হবে? দ্বিতীয়ত, যুবসমাজের পড়ালেখায় মনোযোগ হারানো কিংবা সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির জন্য ঢালাওভাবে ‘প্রেমের নাটক-সিনেমা’কে দায়ী করা একধরনের সস্তা পপুলিজম বা সমস্যার মূল কারণ থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখা। আধুনিক বিশ্বে তরুণদের মানসিক বিকাশের সংকট, বেকারত্ব, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, পারিবারিক দূরত্বের মতো বহুবিধ জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে।

এই বিশাল সংকটকে পাশ কাটিয়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট বিনোদন জনরাকে বলির পাঁঠা বানানো অত্যন্ত অপরিপক্ব দৃষ্টিভঙ্গি। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে জোর করে দেশীয় কনটেন্ট বন্ধ করার পরিণতি হবে আত্মঘাতী। মানুষ তার বিনোদনের খোরাক খুঁজবেই। আজ যদি বাংলাদেশে প্রেমের নাটক বা চলচ্চিত্র নির্মাণ নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে সীমিত করা হয়, তবে তরুণ প্রজন্ম কি নাটক দেখা বন্ধ করে কেবল বিজ্ঞানের ডকুমেন্টারি দেখবে?

কখনোই নয়। তারা নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম কিংবা ভারতীয় ও কোরিয়ান কনটেন্টের দিকে আরও বেশি ঝুঁকবে। এর ফলে আমাদের দেশীয় নাটক ও চলচ্চিত্রশিল্প, যা কয়েক বছর ধরে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে যাবে। নোটিশকারী আইনজীবী সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের বরাত দিয়ে ‘শালীনতা ও নৈতিকতার যুক্তিসংগত বাধানিষেধের’ কথা বলেছেন।

কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, শালীনতা নির্ধারণের জন্য দেশে সেন্সর বোর্ড (বর্তমানে সার্টিফিকেশন বোর্ড) এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কোনো নাটক বা সিনেমায় যদি সস্তা অশ্লীলতা বা কুরুচিপূর্ণ উপাদান থাকে, তবে তার সমালোচনা হতেই পারে এবং নির্মাতা-দর্শকদের ভেতর থেকেই তার মানোন্নয়নের দাবি উঠবে। কিন্তু তাই বলে আস্ত একটি ‘প্রেম’ বা ‘রোমান্স’ জনরাকে নিষিদ্ধ বা সমাজ ধ্বংসের কারণ বলে দাগিয়ে দেওয়া সুস্থ চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না।

ইতিহাস, বিজ্ঞান বা প্রতিরক্ষার মতো কনটেন্ট নির্মিত হওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু তা হতে হবে শিল্পীদের নিজস্ব তাগিদ, রুচিবোধ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। রাষ্ট্র কাউকে জোর করে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির সিনেমা বানাতে বাধ্য করতে পারে না। শিল্প গড়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ততায়, কোনো আইনি খাঁচায় বন্দি করে নয়। আমরা এমন এক সমাজ চাই না, যেখানে জীবন ও শিল্পের স্বাভাবিক রূপকে নোটিশ দিয়ে অবদমিত করা হবে।

এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার মানসিকতা শেষ পর্যন্ত সমাজকে একটি রক্ষণশীল ও দমবন্ধ পরিবেশের দিকে ঠেলে দেয়। আইনি নোটিশ দিয়ে সংস্কৃতির শুদ্ধিকরণ করার এই অবাস্তব চিন্তা বাদ দিয়ে আমাদের উচিত নির্মাতাদের আরও ভালো গল্পের কাজ করার জন্য উৎসাহিত করা এবং দর্শকদের রুচির মান উন্নত করা। শিল্পের মুক্তিই হোক সংস্কৃতির প্রকৃত নিয়ন্তা, আইনি শৃঙ্খল নয়।

সমাজে অশ্লীলতা, কুরুচি বা দায়িত্বহীন কনটেন্ট নিয়ে উদ্বেগ থাকতেই পারে। মানহীন ও ক্ষতিকর কনটেন্টের সমালোচনা হওয়া উচিত, প্রয়োজন হলে প্রচলিত আইন ও নীতিমালার আওতায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনো একটি বিশেষ শিল্পধারাকে, বিশেষ করে প্রেম ও রোমান্সকে, সমাজের সব অনিয়ম, নৈতিক অবক্ষয় বা তরুণদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা বাস্তব সমস্যার সহজীকরণ ছাড়া আর কিছু নয়।

সমাজের জটিল সংকটের সমাধান কোনো একটি জনরাকে নিষিদ্ধ করার মধ্যে নেই; বরং প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানসিক বিকাশ, সুস্থ বিনোদন ও দায়িত্বশীল সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দেশপ্রেম কিংবা সামাজিক মূল্যবোধভিত্তিক ভালো কনটেন্ট অবশ্যই আরও বেশি তৈরি হওয়া প্রয়োজন; তবে এর জন্য নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, সৃজনশীল প্রণোদনা এবং নির্মাতাদের স্বাধীনতা।

শিল্পীকে কী সৃষ্টি করতে হবে, রাষ্ট্রের আইন দিয়ে সেটি নির্ধারণ করা হলে সৃজনশীলতার জায়গায় জন্ম নেয় আনুগত্যের সংস্কৃতি। আর সেই পথ শেষ পর্যন্ত শিল্পকে সমৃদ্ধ করে না, সংকুচিত করে। তাই শিল্পের দুর্বলতা দূর করার পথ আইনি হস্তক্ষেপ নয়; বরং আরও ভালো শিল্প সৃষ্টি, দর্শকের রুচির বিকাশ এবং মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর নিশ্চিত করা। প্রেমকে নিষিদ্ধ করে সমাজকে নৈতিক করা যাবে না; বরং মুক্ত চিন্তা, দায়িত্বশীল শিল্পচর্চা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্য দিয়েই একটি পরিণত সমাজ গড়ে উঠতে পারে।

শিল্পের স্বাধীনতাই হোক আমাদের সাংস্কৃতিক বিকাশের ভিত্তি, আইনি শৃঙ্খল নয়।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

শিল্পকে আইনের খাঁচায় বন্দি করা যায় না

শিল্পকে আইনের খাঁচায় বন্দি করা যায় না

Update Time : 08:01:39 am, Sunday, 30 August 2026

শিল্প ও সংস্কৃতির জগৎ স্বভাবতই মুক্ত, বহুমাত্রিক ও সৃজনশীল। মানুষের অনুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ, আনন্দ, বেদনা, স্বপ্ন ও সংকট, জীবনের এই বিচিত্র অভিজ্ঞতাই যুগে যুগে সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রধান উপাদান হয়ে উঠেছে।

তাই কোনো নির্দিষ্ট শিল্পধারা বা বিষয়কে সামাজিক অবক্ষয়ের একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তা নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। সম্প্রতি প্রেম ও রোমান্সনির্ভর সিনেমা ও নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের দাবিতে একজন আইনজীবীর আইনি নোটিশ সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। নোটিশে তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, পড়াশোনায় অনীহা এবং সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির জন্য প্রেম ও রোমান্সভিত্তিক কনটেন্টকে দায়ী করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দেশপ্রেমমূলক কনটেন্টকে বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে। উদ্দেশ্য যদি হয় সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, সেটি নিঃসন্দেহে আলোচনার যোগ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ যদি হয় শিল্পের বিষয়বৈচিত্র্যকে আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা, তাহলে তা শুধু শিল্পের স্বাধীনতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না; বরং একটি মুক্ত ও সৃজনশীল সমাজের চরিত্র নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে।

কারণ শিল্পকে নির্দেশ দিয়ে ভালো করা যায় না, রুচিকে ফরমান দিয়ে উন্নত করা যায় না এবং মানুষের অনুভূতিকে আইনের খাঁচায় বন্দি করেও সুস্থ সংস্কৃতি নির্মাণ সম্ভব নয়। সাংস্কৃতিক বিকাশ আদালতের রুলিং দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী কেবল প্রেম ও রোমান্সনির্ভর সিনেমা এবং নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের দাবিতে সরকারকে একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।

নোটিশদাতার দাবি, এসব কনটেন্টের কারণে যুবসমাজ পড়ালেখা ছেড়ে ধ্বংস হচ্ছে এবং পরকীয়া ও সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। এর প্রতিকার হিসেবে তিনি ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দেশপ্রেমের কনটেন্ট বাধ্যতামূলক করার আইনি ফরমান চেয়েছেন। প্রথম দেখায় একে খুব ‘নৈতিক ও কল্যাণকামী’ মনে হলেও, গভীর বিশ্লেষণে এই দাবি কেবল অযৌক্তিকই নয়; বরং মুক্তবুদ্ধি ও শৈল্পিক স্বাধীনতার জন্য এক ভয়ংকর লাল সংকেত।

প্রথমত, প্রেম-ভালোবাসা ও মানবিক অনুভূতি মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে শুরু করে কালজয়ী সাহিত্য, নাটক এবং সিনেমার মূল রসদ জুগিয়েছে মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক মনস্তত্ত্ব ও সম্পর্কের টানাপোড়েন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্র, জহির রায়হান থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদÑআমাদের কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তিই ছিল মানবিক সম্পর্কের এই জটিল ও সুন্দর বন্ধন।

এখন কি তবে আইনি নোটিশ দিয়ে সাহিত্যের এই হাজার বছরের ধারাকে খারিজ করে দেওয়া হবে? দ্বিতীয়ত, যুবসমাজের পড়ালেখায় মনোযোগ হারানো কিংবা সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির জন্য ঢালাওভাবে ‘প্রেমের নাটক-সিনেমা’কে দায়ী করা একধরনের সস্তা পপুলিজম বা সমস্যার মূল কারণ থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখা। আধুনিক বিশ্বে তরুণদের মানসিক বিকাশের সংকট, বেকারত্ব, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, পারিবারিক দূরত্বের মতো বহুবিধ জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে।

এই বিশাল সংকটকে পাশ কাটিয়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট বিনোদন জনরাকে বলির পাঁঠা বানানো অত্যন্ত অপরিপক্ব দৃষ্টিভঙ্গি। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে জোর করে দেশীয় কনটেন্ট বন্ধ করার পরিণতি হবে আত্মঘাতী। মানুষ তার বিনোদনের খোরাক খুঁজবেই। আজ যদি বাংলাদেশে প্রেমের নাটক বা চলচ্চিত্র নির্মাণ নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে সীমিত করা হয়, তবে তরুণ প্রজন্ম কি নাটক দেখা বন্ধ করে কেবল বিজ্ঞানের ডকুমেন্টারি দেখবে?

কখনোই নয়। তারা নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম কিংবা ভারতীয় ও কোরিয়ান কনটেন্টের দিকে আরও বেশি ঝুঁকবে। এর ফলে আমাদের দেশীয় নাটক ও চলচ্চিত্রশিল্প, যা কয়েক বছর ধরে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে যাবে। নোটিশকারী আইনজীবী সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের বরাত দিয়ে ‘শালীনতা ও নৈতিকতার যুক্তিসংগত বাধানিষেধের’ কথা বলেছেন।

কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, শালীনতা নির্ধারণের জন্য দেশে সেন্সর বোর্ড (বর্তমানে সার্টিফিকেশন বোর্ড) এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কোনো নাটক বা সিনেমায় যদি সস্তা অশ্লীলতা বা কুরুচিপূর্ণ উপাদান থাকে, তবে তার সমালোচনা হতেই পারে এবং নির্মাতা-দর্শকদের ভেতর থেকেই তার মানোন্নয়নের দাবি উঠবে। কিন্তু তাই বলে আস্ত একটি ‘প্রেম’ বা ‘রোমান্স’ জনরাকে নিষিদ্ধ বা সমাজ ধ্বংসের কারণ বলে দাগিয়ে দেওয়া সুস্থ চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না।

ইতিহাস, বিজ্ঞান বা প্রতিরক্ষার মতো কনটেন্ট নির্মিত হওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু তা হতে হবে শিল্পীদের নিজস্ব তাগিদ, রুচিবোধ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। রাষ্ট্র কাউকে জোর করে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির সিনেমা বানাতে বাধ্য করতে পারে না। শিল্প গড়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ততায়, কোনো আইনি খাঁচায় বন্দি করে নয়। আমরা এমন এক সমাজ চাই না, যেখানে জীবন ও শিল্পের স্বাভাবিক রূপকে নোটিশ দিয়ে অবদমিত করা হবে।

এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার মানসিকতা শেষ পর্যন্ত সমাজকে একটি রক্ষণশীল ও দমবন্ধ পরিবেশের দিকে ঠেলে দেয়। আইনি নোটিশ দিয়ে সংস্কৃতির শুদ্ধিকরণ করার এই অবাস্তব চিন্তা বাদ দিয়ে আমাদের উচিত নির্মাতাদের আরও ভালো গল্পের কাজ করার জন্য উৎসাহিত করা এবং দর্শকদের রুচির মান উন্নত করা। শিল্পের মুক্তিই হোক সংস্কৃতির প্রকৃত নিয়ন্তা, আইনি শৃঙ্খল নয়।

সমাজে অশ্লীলতা, কুরুচি বা দায়িত্বহীন কনটেন্ট নিয়ে উদ্বেগ থাকতেই পারে। মানহীন ও ক্ষতিকর কনটেন্টের সমালোচনা হওয়া উচিত, প্রয়োজন হলে প্রচলিত আইন ও নীতিমালার আওতায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনো একটি বিশেষ শিল্পধারাকে, বিশেষ করে প্রেম ও রোমান্সকে, সমাজের সব অনিয়ম, নৈতিক অবক্ষয় বা তরুণদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা বাস্তব সমস্যার সহজীকরণ ছাড়া আর কিছু নয়।

সমাজের জটিল সংকটের সমাধান কোনো একটি জনরাকে নিষিদ্ধ করার মধ্যে নেই; বরং প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানসিক বিকাশ, সুস্থ বিনোদন ও দায়িত্বশীল সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দেশপ্রেম কিংবা সামাজিক মূল্যবোধভিত্তিক ভালো কনটেন্ট অবশ্যই আরও বেশি তৈরি হওয়া প্রয়োজন; তবে এর জন্য নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, সৃজনশীল প্রণোদনা এবং নির্মাতাদের স্বাধীনতা।

শিল্পীকে কী সৃষ্টি করতে হবে, রাষ্ট্রের আইন দিয়ে সেটি নির্ধারণ করা হলে সৃজনশীলতার জায়গায় জন্ম নেয় আনুগত্যের সংস্কৃতি। আর সেই পথ শেষ পর্যন্ত শিল্পকে সমৃদ্ধ করে না, সংকুচিত করে। তাই শিল্পের দুর্বলতা দূর করার পথ আইনি হস্তক্ষেপ নয়; বরং আরও ভালো শিল্প সৃষ্টি, দর্শকের রুচির বিকাশ এবং মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর নিশ্চিত করা। প্রেমকে নিষিদ্ধ করে সমাজকে নৈতিক করা যাবে না; বরং মুক্ত চিন্তা, দায়িত্বশীল শিল্পচর্চা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্য দিয়েই একটি পরিণত সমাজ গড়ে উঠতে পারে।

শিল্পের স্বাধীনতাই হোক আমাদের সাংস্কৃতিক বিকাশের ভিত্তি, আইনি শৃঙ্খল নয়।