রাজধানীর গাবতলীর কাছেই সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রাম। ব্যস্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশের এই জনপদটি দিনের আলোয় যতটা স্বাভাবিক থাকে, সন্ধ্যার পর এর কিছু অংশের চিত্র ততটাই ভিন্ন হয়ে ওঠে। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় রয়েছে ফাঁকা বালুর মাঠ, নির্মাণাধীন আবাসন ও বিচ্ছিন্ন বসতি।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড়দেশী এলাকায় কমে আসে মানুষের চলাচল। এই সুযোগেই এলাকায় বসে মাদকের আড্ডা ও কেনাবেচা। এলাকায় সংঘবদ্ধ হয়ে চলাফেরা করে কিশোর-তরুণদের একটি অংশ। গত ৫ সেপ্টেম্বর বড়দেশী গ্রামে মদিনা সিটি এলাকায় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বড়দেশীর পুরোনো অপরাধচিত্র নতুন করে সামনে আসে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং ও মাদক-সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আপন-জিহাদসহ কয়েকজন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আপন একটি গ্যাংয়ের মূল হোতা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের মাদক ব্যবসা, নির্জন ভৌগোলিক পরিবেশ, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, স্থানীয় বিরোধ ও নজরদারির ঘাটতি মিলে বড়দেশী এলাকায় তৈরি হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ।
বড়দেশী বালুর মাঠ এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন আমিনবাজার ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা সামসুদ্দিন ওরফে সামসুর দুই ছেলে আপন ও জিহাদ। তাদের ভগ্নিপতি বুলবুল আহম্মেদের হাতে মদিনা হাউজিং এলাকার নিয়ন্ত্রণ। আপনের নেতৃত্বে ওই এলাকায় একটি কিশোর গ্যাং পরিচালিত হয়। ওই গ্যাংয়ে ৩০-৩৫ জন সদস্য রয়েছেন।
আপন ও জিহাদ গ্রেপ্তার এবং সামসু মেম্বার ও বুলবুল পলাতক থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বড়দেশীকে ঘিরে মাদকের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এ এলাকা থেকে বিভিন্ন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলা উত্তরের গোয়েন্দা পুলিশ বড়দেশী গ্রামে অভিযান চালিয়ে সামসু মিয়ার মেয়ে জুলিয়া আক্তার জুলি ও মুনসুর আলীর স্ত্রী মাফিয়া আক্তারকে বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করে।
গত ২১ জুলাই সাভার থানা পুলিশের অভিযানে রুপ ভানু ও তাহমিনাকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৫ সালের জুনে বড়দেশী এলাকা থেকে গাঁজা ও হেরোইনসহ তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে একই এলাকার পশ্চিমপাড়া থেকে হেরোইনসহ এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের মার্চে ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ বড়দেশী পশ্চিমপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২০ কেজি গাঁজাসহ এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করে।
বড়দেশী গ্রাম থেকে প্রায়ই মাদক জব্দ ও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বড়দেশী গ্রামের রাসেল, সোহেল, কাজলসহ সাতজন বাসিন্দা রূপালী বাংলাদেশকে জানান, বড়দেশীর বালুর মাঠসহ নির্জন বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত মাদকের আসর বসে। সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় মানুষের চলাচল কমে যায়। নজরদারিও কঠিন হয়ে পড়ে এসব স্থানে। তারা জানান, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে কথা বললে কখনো কখনো হুমকি বা হয়রানির শিকার হতে হয়।
জানা গেছে, গত দুই দশকে আমিনবাজার ও বড়দেশী এলাকায় বেশকিছু গুরুতর অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। ২০০৭ সালের ৩ মার্চ আমিনবাজারের সালেহপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে র‌্যাব-১১ এর ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর (ডিএডি) হুমায়ুন কবির ও কনস্টেবল ফুল মিয়া নিহত হন। পরে বড়দেশী এলাকায় পুলিশের এসআই মতিউর রহমানও সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন।
২০১১ সালের ১৭ জুলাই শবে বরাতের রাতে বড়দেশীর কেবলারচরে ঘটে দেশের আলোচিত ছয় ছাত্র হত্যাকাণ্ড। ছয় ছাত্র হত্যাকাণ্ড বড়দেশীর নামকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে। একই সঙ্গে ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, গুজব, গণপিটুনি এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এরপরও গুরুতর অপরাধের খবর থামেনি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বড়দেশী এলাকার রূপালি সৈকত হাউজিংয়ের ভেতর একটি গরুর খামারের মালিক ফুয়াদ ইসলাম ও তার দুই বছরের ছেলে আশিককে হত্যা করা হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বড়দেশী উত্তরপাড়া এলাকায় ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনকে নিজ ঘরে হত্যা করা হয়। গত জুলাই মাসে বড়দেশী হাজিনগর এলাকায় শারমিন আক্তার লিজা নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। সর্বশেষ আলোচনায় এসেছে এসআই আলতাফ হোসেন হত্যাকাণ্ড। আলতাফ হত্যার পর বড়দেশীর আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছে কিশোর গ্যাং। সাবেক র‌্যাব ও বর্তমান স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-এসআরবি-১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, ঘটনার সঙ্গে এলাকার কিশোর গ্যাং ও মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হওয়ার পর হামলাকারীরা এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ডেকে আনে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, কিশোর গ্যাংকে শুধু কয়েকজন কিশোরের অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা ধরা পড়বে না। তারা কোথা থেকে অর্থ পায়, কে তাদের মাদক সরবরাহ করে, কারা তাদের ব্যবহার করে— এসব প্রশ্নের উত্তরও জরুরি। বিশেষ করে কোনো তরুণের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার পরও যদি সে এলাকায় সক্রিয় থাকে, তাহলে শুধু গ্রেপ্তার নয়, জামিন, মামলার তদন্ত, চার্জশিট, বিচার এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পুরো প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, ‘বড়দেশী নামের ওই গ্রামের প্রকৃত অপরাধচিত্র জানতে হলে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রাইম ম্যাপ তৈরি করা প্রয়োজন। গত ১০ বছরের হত্যা, মাদক, অস্ত্র, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ ও মারামারির মামলা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ঘটনাগুলোর স্থান, সময়, বয়স, আসামিদের পূর্ব অপরাধের ইতিহাস এবং মামলার বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করলে কোন এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তা চিহ্নিত করা সম্ভব।
একই ব্যক্তি বা একই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে কি না, সেটিও হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সূচক। পুলিশের মামলা, আদালতের নথি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হলে বড়দেশীর অপরাধের প্রকৃতি সম্পর্কে তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া যেতে পারে। ’ সংশ্লিষ্টরা জানান, বড়দেশী গ্রামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর ভৌগোলিক অবস্থান।
ঘনবসতির পাশাপাশি রয়েছে ফাঁকা জমি ও বালুর মাঠ। রাজধানীর কাছাকাছি হলেও অনেক এলাকায় এখনো উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বেশকিছু এলাকায় পাকা রাস্তার ঘাটতিও রয়েছে। এই সুযোগে এই এলাকায় ভয়ঙ্কর সব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম বলেন, ‘বড়দেশী গ্রামের চলাচলের ব্যবস্থা নাজুক হলেও এলাকাটিকে বিশেষ নজরদারিতে রাখার পরিকল্পনা চলছে।
অপরাধীদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারে সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা চলছে। ’ ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনও মাদক ব্যবসায়ী ও কিশোর গ্যাং প্রতিহত করতে সবার সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তবে নজরদারি কতটা কার্যকর, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত টহল, বিট পুলিশিং, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, মাদক স্পট চিহ্নিতকরণ এবং অভিযানের পরবর্তী ফলোআপ— সব কার্যক্রম সমন্বিতভাবে চলছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।





















