একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো তার শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা কেবল অক্ষরজ্ঞান বা ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং এটি মানবসম্পদকে দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে তোলার প্রধান হাতিয়ার।
স্বাধীনতার পর থেকে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিকাঠামো, ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির হার এবং সাক্ষরতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার গুণগত মান এবং বাস্তবমুখী সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।
আশির ও নব্বইয়ের দশকে বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বাড়াতে নানামুখী সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, যা পরে নারী শিক্ষার প্রসারে বড় ভূমিকা রাখে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমরা ডিজিটাল শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রাথমিক মেলবন্ধন লক্ষ করি। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘকাল ধরে মূলত তাত্ত্বিক এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক রয়ে গেছে।
যেখানে একজন শিক্ষার্থীর মেধার মূল্যায়ন করা হতো মূলত মুখস্থ করার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণার পরিবর্তন ঘটছে। বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিক্ষাকে কর্মমুখী করা, কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং প্রাথমিক স্তর থেকেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সক্ষমতা বৃদ্ধি বা ক্যাপাসিটি বিল্ডিং বলতে বোঝায় এমন একটি প্রক্রিয়া, যা একজন ব্যক্তিকে বাস্তব জীবনের জটিলতা সমাধান, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পেশাগত ক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার যোগ্য করে তোলে।
আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি স্পষ্ট করে দেয় যে সনাতন ডিগ্রি অর্জনের সঙ্গে বাস্তব বাজারের চাহিদার একটি বড় দূরত্ব বা ‘স্কিল গ্যাপ’ রয়ে গেছে। সাধারণ শিক্ষার কারিকুলামে তত্ত্বের আধিক্য থাকায় শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে একদম নতুনভাবে কাজ শিখতে বাধ্য হয়, যা জাতীয় উৎপাদনশীলতাকে ধীরগতির করে দেয়।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের মূল অভীষ্ট হলো শিক্ষার্থীর সুপ্ত ব্যক্তিগত মেধা ও স্বাধীন চিন্তাশক্তির বিকাশ সাধন। উদাহরণস্বরূপ, ফিনল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেল প্রথাগত মুখস্থবিদ্যা কিংবা পরীক্ষার মনস্তাত্ত্বিক চাপকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে ‘খেলার ছলে শিখন’ এবং ‘সমস্যা সমাধানভিত্তিক’ প্রায়োগিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, যা মূলত তাত্ত্বিক পড়াশোনার ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তব জীবনের উপযোগী কর্মদক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে।
বৈপরীত্যের দিক থেকে জার্মানির অনন্য ‘ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম’ মাধ্যমিক স্তর থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শিল্পকারখানায় সরাসরি বাস্তবমুখী শিক্ষানবিশ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক পাঠ চুকানোর আগেই পেশাদার মানবসম্পদে রূপান্তরিত হয়।
অপরদিকে, পূর্ব এশিয়ার জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধ, দলগত সমন্বয় এবং শৃঙ্খলার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছে, যা তাদের তরুণ প্রজন্মকে বৈশ্বিক করপোরেট পরিম-লে দূরদর্শী নেতৃত্ব প্রদানের উপযুক্ত করে গড়ে তুলছে। এর বিপরীতে, আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা একটি দীর্ঘ সময় ব্যয় করে এমন কিছু বিষয় মুখস্থ করতে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক।
উন্নত বিশ্বে শিক্ষাকে দেখা হয় অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে, আর আমাদের এখানে অনেক ক্ষেত্রেই একে দেখা হয় কেবল একটি সনদ অর্জনের সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে।
দেশের টেকসই উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে রেকর্ড ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ (গত অর্থবছরের ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি) এবং ২০২৮ সালের মধ্যে যুগোপযোগী কারিকুলাম বাস্তবায়নের যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
তবে ইউনেসকো নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মানদ- (জিডিপির অন্তত ৪-৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ) অর্জন এবং এই উদ্যোগকে প্রকৃত অর্থে বৈশ্বিক স্তরে উন্নীত করতে হলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু মৌলিক ও আমূল সংস্কার আনা জরুরি। প্রথমত, প্রচলিত মুখস্থনির্ভরতা এবং নম্বরভিত্তিক পরীক্ষাব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা যাচাইয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নপদ্ধতি চালু করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মাধ্যমিক স্তর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, কোডিং, ডেটা অ্যানালিটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাথমিক ধারণার পাশাপাশি বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষার সুযোগ প্রসারিত করা সময়ের দাবি। তৃতীয়ত, যেকোনো নতুন শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নে মূল ভিত্তি হলেন শিক্ষকেরা, তাই আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে তাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সর্বোপরি, উচ্চশিক্ষার সিলেবাসকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতে এবং শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তুলতে ইন্টার্নশিপ ও ব্যাবহারিক প্রজেক্ট বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ‘শিল্প ও একাডেমিয়া মেলবন্ধন’ গড়ে তোলা আবশ্যক। শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর রাতারাতি সম্ভব নয়; এটি একটি ধারাবাহিক ও সমন্বিত প্রক্রিয়া।
বর্তমান নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শী চিন্তাভাবনা এবং শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা একটি ইতিবাচক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। আমাদের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি সঠিক ও কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করা যায়, তবে এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা তরুণ জনমিতির সুবিধা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি উন্নত ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।
শিক্ষা হোক কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং আত্মমর্যাদা ও যোগ্যতা নিয়ে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ানোর প্রধান শক্তি।




















