ঢাকায় দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ (বিসিডিপি) নলেজ কনফারেন্স ২০২৬-এর উদ্বোধন হয়েছে। বুধবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি ৫০০ জনের বেশি জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিরা অংশ নেন।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহযোগিতায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০৫০’ বাস্তবায়ন এবং ‘জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি ৩.০)’-এর কৌশলগত বিনিয়োগ রূপরেখা বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো।
উদ্বোধনী দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘জলবায়ু সমাধান প্রদর্শনী’ এবং ‘বিসিডিপি ওয়েব পোর্টাল’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। নতুন এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দেশি ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিনিয়োগ সহজতর করতে রিয়েল-টাইম প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, পাইপলাইন ব্যবস্থাপনা, ডেটা একত্রীকরণ ও আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের কেন্দ্রীয় হাব হিসেবে কাজ করবে।
এ ছাড়া সম্মেলনে ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিসিডিপি প্ল্যাটফর্মকে জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহ, সম্পদ বণ্টন ও নীতি নির্ধারণের একক জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে পুনরায় সুদৃঢ় করা হয়। সম্মেলনের পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে জ্বালানি রূপান্তর, টেকসই পরিবহন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন এবং বিসিডিপি ওয়েব পোর্টালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি বর্তমান অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের ওপর গুরুত্ব দেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘আজকের উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোই আগামী কয়েক দশকের জন্য আমাদের জলবায়ু ঝুঁকির রূপরেখা নির্ধারণ করে দেবে। জাতীয় নীতি ও কৌশলগুলোকে সমন্বিত কর্মসূচি, মানসম্মত প্রকল্প, উপযুক্ত অর্থায়ন ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপান্তর করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
অভিযোজনসংক্রান্ত উদ্যোগগুলোর বিশেষ আর্থিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যিক মুনাফা না থাকলেও এসব উদ্যোগ অপরিহার্য সামাজিক কল্যাণ সাধন করে। তাই বাংলাদেশের আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জলবায়ু অর্থায়নের রূপরেখা তৈরি করতে হবে।’
পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, ‘ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকি’ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জলবায়ু সুবিচারের দাবি এবং প্রকল্প প্রণয়ন ও পরিচালনায় নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের ওপর জোর দেন মন্ত্রী।
এডিবির পক্ষে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, লাও পিডিআর, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের প্রতিনিধিত্বকারী নির্বাহী পরিচালক সত্য শ্রীনিবাস লোলা। তিনি বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ এবং চলমান জলবায়ু ঝুঁকির দ্বিমুখী বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘এই সম্মেলনের প্রকৃত সাফল্য কেবল আলোচনায় নয়, বরং পরবর্তী পদক্ষেপ ও কার্যকর বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করবে। উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাত থেকেই বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই পার্টনারশিপের মূল লক্ষ্য হলো অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও অংশীদারত্বকে একসূত্রে বাঁধা, যাতে বাংলাদেশ নীতিগত অঙ্গীকার থেকে সরাসরি কার্যকর বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।’
উদ্বোধনী অধিবেশনে সরকারি ও উন্নয়ন খাতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার।
স্বাগত বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম।
প্রথম দিনে তিনটি কৌশলগত প্লেনারি বা পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ‘পাথওয়েজ টু রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড লো কার্বন গ্রোথ’ শীর্ষক প্রথম প্লেনারিতে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও অর্থনৈতিক অগ্রগতি বজায় রাখার ম্যাক্রো-কৌশলগত রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়।
দ্বিতীয় প্লেনারিতে স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন, খাতভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণ এবং জাতীয় বাজেট বরাদ্দ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০৫০’ কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
তৃতীয় প্লেনারিতে এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর (এমডিবি) আর্থিক সরঞ্জাম এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ পুঁজি ব্যবহারের কৌশলগুলো মূল্যায়ন করা হয়।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার জলবায়ু বিনিয়োগের ঝুঁকি হ্রাস, বিনিয়োগবান্ধব প্রকল্প পাইপলাইন তৈরি এবং জ্বালানি, পরিবহন ও কৃষি খাতে সরকারি-বেসরকারি অর্থায়ন কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে গঠিত কারিগরি অধিবেশন ও বিশেষায়িত ওয়ার্কিং গ্রুপের আলোচনা হবে। এর মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী সম্মেলন শেষ হবে।




















