3:13 am, Tuesday, 3 November 2026

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক ও প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফর

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক ও প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফর

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

২৬ অক্টোবরের প্রথম প্রহর। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও প্রতিনিধিদল ঢাকা ছাড়লেন। টোকিওর নারিতায় নামার কথা স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে।

চার দিনের এই সফরের আমন্ত্রণকর্তা জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। এমন সফরে থাকে লাল গালিচা, করমর্দনের ছবি আর যৌথ বিবৃতির মার্জিত বাক্য। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, সফরের মূল্য বিমান থেকে নামার ছবিতে মাপা হয় না। মাপা হয় ফিরে আসার তিন মাস, ছয় মাস, তিন বছর পর। তখন দেখা যায় কাগজের প্রতিশ্রুতির কতটুকু কংক্রিট হলো, কতটুকু কর্মসংস্থান হলোÑ আর কতটুকু রপ্তানি আয় হলো।

এই সম্পাদকীয় তাই সফরের বর্ণনা নয়। এটি একটি হিসাবের খাতা খোলার প্রস্তাব। জাপান বাংলাদেশের কাছে এমন এক অংশীদার, যে কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে মাতারবাড়ী বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল, শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে জাপানের ছাপ স্পষ্ট। অথচ এই নীরবতার একটা ঝুঁকিও আছে।

উচ্চকণ্ঠ বন্ধুর শর্ত সবাই শোনে। নীরব বন্ধুর শর্ত লুকিয়ে থাকে চুক্তির পাতায়। এক দশকের বেশি সময় জাইকা বাংলাদেশকে দিয়েছে মাত্র ০.০১ শতাংশ সুদে ঋণ, কিন্তু ২০১৭ সালে সেই সুবিধা কমতে শুরু করে। জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেললাইনের ঋণে প্রথমবারের মতো দুই শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী জাইকা ২০২৬ সালের এপ্রিল-সেপ্টেম্বর মেয়াদে ৩.০৫ শতাংশ হার ধার্য করেছে।

হিসাবের সুবিধার্থে ধরা যাক ১০০ কোটি ডলারের একটি ঋণ। ০.০১ শতাংশে বছরে সুদ ১ লাখ ডলার, দুই শতাংশে ২ কোটি ডলার, অর্থাৎ ২০০ গুণ। এ ব্যবধান ব্যাংকের খাতার বিষয় নয়। এটি স্কুল, হাসপাতাল আর সড়কের বাজেট থেকে কেটে নেওয়া অর্থ। তবে ন্যায্যতার খাতিরে বলতে হয়, বাড়ার পরেও জাপানি ঋণ অনেক বিকল্প উৎসের চেয়ে সস্তা। দর-কষাকষি তাই ছাড় চাওয়ার, সম্পর্ক ভাঙার নয়।

কিলোমিটারপ্রতি খরচের হিসাবটা আরও অস্বস্তিকর। দাখিল করা দরপত্র অনুযায়ী ঢাকার দুটি নতুন মেট্রো পথে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা, আর উত্তরা-মতিঝিল লাইনে তা ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি। ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০১৯ সালে অনুমোদিত এমআরটি-১ প্রকল্পের ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকার ব্যয় সমীক্ষার পর প্রায় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটিতে এবং এমআরটি-৫-এর ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি প্রায় ৮৮ হাজার কোটিতে ওঠার প্রস্তাব এসেছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী মেট্রোরেলের ব্যয় ও ঋণের সুদ কমানোর বিষয়টি সফরে আলোচনায় আসার সম্ভাবনা আছে। আলোচনা হলেও যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নিরীক্ষাযোগ্য ফল। আবার সময়ও হাতে অফুরন্ত নেই, কারণ জাইকা নিয়মিত সুদের হার পুনর্বিবেচনা করে, আর সিদ্ধান্তে দেরি হলে নতুন হারের মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে। কৌশলটা তাই ‘দ্রুত, কিন্তু যাচাই করে’।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য ছিল প্রায় ৩২৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি আনুমানিক ১৫০ কোটি, আমদানি ১৭৫ কোটি, ফলে ঘাটতি প্রায় ২৫ কোটি ডলার। এ বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এই চিত্র বদলাতে পারে। চুক্তিতে জাপান বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৯৭ শতাংশ।

বিনিময়ে বাংলাদেশ দিয়েছে ১ হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্যে বিশেষ সুবিধা। কিন্তু শুল্কমুক্ত সুবিধা দরজা খোলে, ঘরে ঢোকার ব্যবস্থা করে না। জাপানি ক্রেতা বিশ্বের অন্যতম কড়া মানের ক্রেতা। সময়মতো সরবরাহ, নিখুঁত মান আর পরিবেশ-শ্রম সনদ না থাকলে শূন্য শুল্কও অর্ডার আনবে না। জাপানে পোশাক রপ্তানি ২০২৪-২৫ সালে ছিল প্রায় ১১৮ কোটি ডলার, লক্ষ্য ৩০০ কোটি।

এ লক্ষ্য ছুঁতে শুধু শার্ট-ট্রাউজার নয়, চামড়া, পাট, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত মাছ ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে নতুন পণ্যভান্ডার লাগবে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা ছাড়ার পর যখন অন্যান্য বাজারের সুবিধা কমবে, তখন জাপান হতে পারে ভরসার জায়গা। সফরসূচির দিকে তাকালে একটি নকশা চোখে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী চিবার ফুতসুতে জেরার এলএনজি টার্মিনাল এবং একটি টয়োটা কারখানা পরিদর্শন করবেন।

তালিকায় ইউনিক্লোর সদর দপ্তরও আছে। জ¦ালানি, শিল্প ও খুচরা বিপণন, তিন প্রান্তের তিনটি গন্তব্য। বিশেষ করে ইউনিক্লো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা পোশাক বানায় না, বিশ্বজুড়ে পোশাক কেনে। কারখানা দেখানোর চেয়ে ক্রেতার দপ্তরে বসে ক্রয়াদেশের কথা বলা রপ্তানির দিক থেকে বেশি কার্যকর হতে পারে। বিনিয়োগের দিকে সংবাদে এসেছে, টয়োটার প্রতিনিধিদল ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনের পরিকল্পনা জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৯ সালে উৎপাদন শুরু হতে পারে। জাপানের বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ছে আর শ্রমশক্তি কমছে। বাংলাদেশের তরুণ কর্মীদের জন্য এটি সুযোগ। দুই দেশ একটি জনশক্তি চুক্তি চূড়ান্ত করতে কাজ করছে, যা সফরের অন্যতম প্রধান ফলাফল হতে পারে। ১৭ অক্টোবর কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছে, আর ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে নিয়োগ শুরুর কথা।

পাঁচ বছরে এক লাখ কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনাও ঘোষিত। কিন্তু ‘এক লাখ’ সংখ্যাটা নিজে কিছু বলে না। প্রশ্ন হলো, একজন কর্মী যাওয়ার আগে কত টাকা ঋণ করবেন, জাপানি ভাষায় কতটা দক্ষ হবেন, আর ফিরে এসে কী দক্ষতা নিয়ে আসবেন। দালালচক্রে ডুবে ঋণের বোঝা নিয়ে যাওয়া কর্মী দেশের জন্য রেমিট্যান্স নয়, ঝুঁকি। তাই আমরা প্রস্তাব করি, শুরু থেকেই ‘নিয়োগকারী-বহনকৃত অভিবাসন ব্যয়’ নীতি।

অর্থাৎ যাওয়ার খরচের সিংহভাগ বহন করবে জাপানি নিয়োগদাতা বা সরকারি-পর্যায়ের কাঠামো, কর্মী নয়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীনে, তারপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে। জাপান সফর সেই ধারার ভারসাম্যের কূটনীতিরই অংশ। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে জাপানের নবায়িত ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ বিনিয়োগ, জ¦ালানি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিকে এক কাঠামোয় এনেছে।

বঙ্গোপসাগর এখন বড় শক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্র। এখানে বাংলাদেশের স্বার্থ হলোÑ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো শিবিরে নাম লেখানো নয়। জাপানের অর্থ আসবে বন্দর, বিদ্যুৎ ও শিল্পাঞ্চলে। সেই অবকাঠামো যেন কোনো সামরিক বা কৌশলগত সমীকরণের ছায়ায় না পড়ে, তা নিশ্চিত করা দরকার। সফর যেদিন শেষ হবে, সেদিন সরকারের উচিত জনসমক্ষে একটি ‘জাপান স্কোরকার্ড’ প্রকাশ করা এবং প্রতি তিন মাসে তা হালনাগাদ করা।

আমাদের প্রস্তাবিত ছয়টি মাপকাঠি: ১. সুদ ও ব্যয় : জাইকার ঋণের হার ও মেট্রো প্রকল্পের ব্যয় কমানোর লিখিত ফল কী, তা প্রকাশ। ২. স্মারক থেকে চুক্তি : কয়টি সমঝোতা স্মারক সই হলো, কয়টি আইনি চুক্তিতে রূপ নিল, আর বাকিগুলোর সময়সীমা কত। ৩. ইপিএর ব্যবহার : মোট রপ্তানির কত শতাংশ প্রকৃতপক্ষে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে যাচ্ছে। ৪. বিনিয়োগের তিন স্তর : ঘোষিত, নিবন্ধিত ও উৎপাদনে-যাওয়া বিনিয়োগের আলাদা হিসাব।

৫. কর্মী ও অভিবাসন ব্যয় : কতজন গেলেন, গড় অভিবাসন খরচ কত, আর কতজন ভাষা-দক্ষতা সনদ নিয়ে গেলেন। ৬. বাণিজ্য ঘাটতি : ২৫ কোটি ডলারের ঘাটতি কমল, না বাড়ল। এই ছয় সূচক সরকারের জন্য বিব্রতকর নয়, বরং রক্ষাকবচ। কারণ যে সফর হিসাব দিতে পারে, তার সাফল্যের দাবি বিশ্বাসযোগ্য হয়। জাপান নির্ভরযোগ্য বন্ধু, এ নিয়ে সংশয় কম। কিন্তু বন্ধুত্বেরও হিসাব থাকে, আর সেই হিসাব যত স্বচ্ছ, বন্ধুত্ব তত দীর্ঘস্থায়ী।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে সুযোগ আছে এই সম্পর্ককে অনুদান-ঋণের চেনা ছক থেকে বের করে সমান মর্যাদার অংশীদারত্বে নিয়ে যাওয়ার। সেখানে বাংলাদেশ শুধু প্রকল্প চাইবে না, নিজের শর্তও বলবে। শুধু শ্রমিক পাঠাবে না, দক্ষতা নিয়ে ফেরাবে। শুধু পোশাক বেচবে না, মূল্য সংযোজনের সিঁড়িতে ওপরে উঠবে। প্রধানমন্ত্রী যখন দেশে ফিরবেন, তখন যেন সঙ্গে থাকে পূর্ণ একটি খাতা, যার প্রতিটি পাতায় তারিখ, অঙ্ক আর দায়িত্বপ্রাপ্ত নাম লেখা।

টোকিওর টেবিলে সফর শেষ হলেও ঢাকার টেবিলে আসল কাজ শুরু হবে তখনই।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক ও প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফর

Update Time : 01:51:06 am, Tuesday, 3 November 2026

২৬ অক্টোবরের প্রথম প্রহর। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও প্রতিনিধিদল ঢাকা ছাড়লেন। টোকিওর নারিতায় নামার কথা স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে।

চার দিনের এই সফরের আমন্ত্রণকর্তা জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। এমন সফরে থাকে লাল গালিচা, করমর্দনের ছবি আর যৌথ বিবৃতির মার্জিত বাক্য। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, সফরের মূল্য বিমান থেকে নামার ছবিতে মাপা হয় না। মাপা হয় ফিরে আসার তিন মাস, ছয় মাস, তিন বছর পর। তখন দেখা যায় কাগজের প্রতিশ্রুতির কতটুকু কংক্রিট হলো, কতটুকু কর্মসংস্থান হলোÑ আর কতটুকু রপ্তানি আয় হলো।

এই সম্পাদকীয় তাই সফরের বর্ণনা নয়। এটি একটি হিসাবের খাতা খোলার প্রস্তাব। জাপান বাংলাদেশের কাছে এমন এক অংশীদার, যে কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে মাতারবাড়ী বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল, শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে জাপানের ছাপ স্পষ্ট। অথচ এই নীরবতার একটা ঝুঁকিও আছে।

উচ্চকণ্ঠ বন্ধুর শর্ত সবাই শোনে। নীরব বন্ধুর শর্ত লুকিয়ে থাকে চুক্তির পাতায়। এক দশকের বেশি সময় জাইকা বাংলাদেশকে দিয়েছে মাত্র ০.০১ শতাংশ সুদে ঋণ, কিন্তু ২০১৭ সালে সেই সুবিধা কমতে শুরু করে। জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেললাইনের ঋণে প্রথমবারের মতো দুই শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী জাইকা ২০২৬ সালের এপ্রিল-সেপ্টেম্বর মেয়াদে ৩.০৫ শতাংশ হার ধার্য করেছে।

হিসাবের সুবিধার্থে ধরা যাক ১০০ কোটি ডলারের একটি ঋণ। ০.০১ শতাংশে বছরে সুদ ১ লাখ ডলার, দুই শতাংশে ২ কোটি ডলার, অর্থাৎ ২০০ গুণ। এ ব্যবধান ব্যাংকের খাতার বিষয় নয়। এটি স্কুল, হাসপাতাল আর সড়কের বাজেট থেকে কেটে নেওয়া অর্থ। তবে ন্যায্যতার খাতিরে বলতে হয়, বাড়ার পরেও জাপানি ঋণ অনেক বিকল্প উৎসের চেয়ে সস্তা। দর-কষাকষি তাই ছাড় চাওয়ার, সম্পর্ক ভাঙার নয়।

কিলোমিটারপ্রতি খরচের হিসাবটা আরও অস্বস্তিকর। দাখিল করা দরপত্র অনুযায়ী ঢাকার দুটি নতুন মেট্রো পথে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা, আর উত্তরা-মতিঝিল লাইনে তা ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি। ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০১৯ সালে অনুমোদিত এমআরটি-১ প্রকল্পের ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকার ব্যয় সমীক্ষার পর প্রায় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটিতে এবং এমআরটি-৫-এর ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি প্রায় ৮৮ হাজার কোটিতে ওঠার প্রস্তাব এসেছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী মেট্রোরেলের ব্যয় ও ঋণের সুদ কমানোর বিষয়টি সফরে আলোচনায় আসার সম্ভাবনা আছে। আলোচনা হলেও যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নিরীক্ষাযোগ্য ফল। আবার সময়ও হাতে অফুরন্ত নেই, কারণ জাইকা নিয়মিত সুদের হার পুনর্বিবেচনা করে, আর সিদ্ধান্তে দেরি হলে নতুন হারের মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে। কৌশলটা তাই ‘দ্রুত, কিন্তু যাচাই করে’।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য ছিল প্রায় ৩২৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি আনুমানিক ১৫০ কোটি, আমদানি ১৭৫ কোটি, ফলে ঘাটতি প্রায় ২৫ কোটি ডলার। এ বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এই চিত্র বদলাতে পারে। চুক্তিতে জাপান বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৯৭ শতাংশ।

বিনিময়ে বাংলাদেশ দিয়েছে ১ হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্যে বিশেষ সুবিধা। কিন্তু শুল্কমুক্ত সুবিধা দরজা খোলে, ঘরে ঢোকার ব্যবস্থা করে না। জাপানি ক্রেতা বিশ্বের অন্যতম কড়া মানের ক্রেতা। সময়মতো সরবরাহ, নিখুঁত মান আর পরিবেশ-শ্রম সনদ না থাকলে শূন্য শুল্কও অর্ডার আনবে না। জাপানে পোশাক রপ্তানি ২০২৪-২৫ সালে ছিল প্রায় ১১৮ কোটি ডলার, লক্ষ্য ৩০০ কোটি।

এ লক্ষ্য ছুঁতে শুধু শার্ট-ট্রাউজার নয়, চামড়া, পাট, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত মাছ ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে নতুন পণ্যভান্ডার লাগবে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা ছাড়ার পর যখন অন্যান্য বাজারের সুবিধা কমবে, তখন জাপান হতে পারে ভরসার জায়গা। সফরসূচির দিকে তাকালে একটি নকশা চোখে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী চিবার ফুতসুতে জেরার এলএনজি টার্মিনাল এবং একটি টয়োটা কারখানা পরিদর্শন করবেন।

তালিকায় ইউনিক্লোর সদর দপ্তরও আছে। জ¦ালানি, শিল্প ও খুচরা বিপণন, তিন প্রান্তের তিনটি গন্তব্য। বিশেষ করে ইউনিক্লো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা পোশাক বানায় না, বিশ্বজুড়ে পোশাক কেনে। কারখানা দেখানোর চেয়ে ক্রেতার দপ্তরে বসে ক্রয়াদেশের কথা বলা রপ্তানির দিক থেকে বেশি কার্যকর হতে পারে। বিনিয়োগের দিকে সংবাদে এসেছে, টয়োটার প্রতিনিধিদল ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনের পরিকল্পনা জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৯ সালে উৎপাদন শুরু হতে পারে। জাপানের বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ছে আর শ্রমশক্তি কমছে। বাংলাদেশের তরুণ কর্মীদের জন্য এটি সুযোগ। দুই দেশ একটি জনশক্তি চুক্তি চূড়ান্ত করতে কাজ করছে, যা সফরের অন্যতম প্রধান ফলাফল হতে পারে। ১৭ অক্টোবর কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছে, আর ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে নিয়োগ শুরুর কথা।

পাঁচ বছরে এক লাখ কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনাও ঘোষিত। কিন্তু ‘এক লাখ’ সংখ্যাটা নিজে কিছু বলে না। প্রশ্ন হলো, একজন কর্মী যাওয়ার আগে কত টাকা ঋণ করবেন, জাপানি ভাষায় কতটা দক্ষ হবেন, আর ফিরে এসে কী দক্ষতা নিয়ে আসবেন। দালালচক্রে ডুবে ঋণের বোঝা নিয়ে যাওয়া কর্মী দেশের জন্য রেমিট্যান্স নয়, ঝুঁকি। তাই আমরা প্রস্তাব করি, শুরু থেকেই ‘নিয়োগকারী-বহনকৃত অভিবাসন ব্যয়’ নীতি।

অর্থাৎ যাওয়ার খরচের সিংহভাগ বহন করবে জাপানি নিয়োগদাতা বা সরকারি-পর্যায়ের কাঠামো, কর্মী নয়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীনে, তারপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে। জাপান সফর সেই ধারার ভারসাম্যের কূটনীতিরই অংশ। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে জাপানের নবায়িত ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ বিনিয়োগ, জ¦ালানি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিকে এক কাঠামোয় এনেছে।

বঙ্গোপসাগর এখন বড় শক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্র। এখানে বাংলাদেশের স্বার্থ হলোÑ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো শিবিরে নাম লেখানো নয়। জাপানের অর্থ আসবে বন্দর, বিদ্যুৎ ও শিল্পাঞ্চলে। সেই অবকাঠামো যেন কোনো সামরিক বা কৌশলগত সমীকরণের ছায়ায় না পড়ে, তা নিশ্চিত করা দরকার। সফর যেদিন শেষ হবে, সেদিন সরকারের উচিত জনসমক্ষে একটি ‘জাপান স্কোরকার্ড’ প্রকাশ করা এবং প্রতি তিন মাসে তা হালনাগাদ করা।

আমাদের প্রস্তাবিত ছয়টি মাপকাঠি: ১. সুদ ও ব্যয় : জাইকার ঋণের হার ও মেট্রো প্রকল্পের ব্যয় কমানোর লিখিত ফল কী, তা প্রকাশ। ২. স্মারক থেকে চুক্তি : কয়টি সমঝোতা স্মারক সই হলো, কয়টি আইনি চুক্তিতে রূপ নিল, আর বাকিগুলোর সময়সীমা কত। ৩. ইপিএর ব্যবহার : মোট রপ্তানির কত শতাংশ প্রকৃতপক্ষে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে যাচ্ছে। ৪. বিনিয়োগের তিন স্তর : ঘোষিত, নিবন্ধিত ও উৎপাদনে-যাওয়া বিনিয়োগের আলাদা হিসাব।

৫. কর্মী ও অভিবাসন ব্যয় : কতজন গেলেন, গড় অভিবাসন খরচ কত, আর কতজন ভাষা-দক্ষতা সনদ নিয়ে গেলেন। ৬. বাণিজ্য ঘাটতি : ২৫ কোটি ডলারের ঘাটতি কমল, না বাড়ল। এই ছয় সূচক সরকারের জন্য বিব্রতকর নয়, বরং রক্ষাকবচ। কারণ যে সফর হিসাব দিতে পারে, তার সাফল্যের দাবি বিশ্বাসযোগ্য হয়। জাপান নির্ভরযোগ্য বন্ধু, এ নিয়ে সংশয় কম। কিন্তু বন্ধুত্বেরও হিসাব থাকে, আর সেই হিসাব যত স্বচ্ছ, বন্ধুত্ব তত দীর্ঘস্থায়ী।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে সুযোগ আছে এই সম্পর্ককে অনুদান-ঋণের চেনা ছক থেকে বের করে সমান মর্যাদার অংশীদারত্বে নিয়ে যাওয়ার। সেখানে বাংলাদেশ শুধু প্রকল্প চাইবে না, নিজের শর্তও বলবে। শুধু শ্রমিক পাঠাবে না, দক্ষতা নিয়ে ফেরাবে। শুধু পোশাক বেচবে না, মূল্য সংযোজনের সিঁড়িতে ওপরে উঠবে। প্রধানমন্ত্রী যখন দেশে ফিরবেন, তখন যেন সঙ্গে থাকে পূর্ণ একটি খাতা, যার প্রতিটি পাতায় তারিখ, অঙ্ক আর দায়িত্বপ্রাপ্ত নাম লেখা।

টোকিওর টেবিলে সফর শেষ হলেও ঢাকার টেবিলে আসল কাজ শুরু হবে তখনই।