4:27 am, Tuesday, 3 November 2026

সবুজহীন এক শহরের গল্প

সবুজহীন এক শহরের গল্প

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

এমন একটি শহরের কথা ভাবুন, যেখানে কোনো গাছ নেই। নেই পাখির ডাক, নেই পাতার মর্মর শব্দ, আর বৃষ্টির পর ভেজা মাটির গন্ধও অনুপস্থিত। চারপাশে কেবল রঙিন বাড়িঘর, প্লাস্টিকের ঘাস এবং কৃত্রিম গাছপালা। এমনকি নির্মল বাতাস পাওয়ার জন্যও সেখানকার বাসিন্দাদের টাকা খরচ করতে হয়।

শুনতে কেমন অদ্ভুত লাগছে, তাই না? এমনই এক শহরের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছিল ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া অ্যানিমেশন সিনেমা দ্য লরাক্স। গল্পের শুরু থিনিডভিল নামের একটি শহর থেকে। শহরটি দেখতে বেশ সুন্দর। বাড়িঘরগুলো রঙিন, রাস্তাঘাট ঝকঝকে। সবকিছুই যেন ছবির মতো সাজানো। কিন্তু এই শহরের একটি বড় সমস্যা আছে। এখানে কোনো আসল গাছ নেই। ঘাস থেকে শুরু করে ফুল, এমনকি গাছের পাতাও তৈরি করা হয়েছে প্লাস্টিক দিয়ে।

শহরের বাসিন্দারা কৃত্রিম গাছের সৌন্দর্য উপভোগ করলেও প্রকৃতির আসল রূপ সম্পর্কে তাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। বিশুদ্ধ বাতাসের জন্যও তাদের নির্ভর করতে হয় বোতলে ভরা বাতাসের ওপর। এই বাতাস বিক্রি করেই বেশ ভালো ব্যবসা করছে শহরের মেয়র অ্যালয়সিয়াস ও’হায়ার। এই শহরেই থাকে টেড উইগিন্স নামের বারো বছর বয়সি এক কিশোর। টেডের মা ও দাদি নর্মার সঙ্গে তার ছোট্ট সংসার।

টেডের পাশের বাড়িতে থাকে অড্রে নামের একটি মেয়ে। অড্রের খুব ইচ্ছা, সে একদিন সত্যিকারের একটি গাছ দেখবে। কারণ বইয়ে গাছের ছবি দেখলেও বাস্তবে গাছ কেমন, তা সে কখনো দেখেনি। অড্রের এই ইচ্ছার কথা শুনে টেডও ঠিক করে, যেভাবেই হোক তাকে একটি আসল গাছ এনে দেবে। কিন্তু সমস্যা হলো, গাছ তারা পাবে কোথায়? শহরের চারদিকে উঁচু দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে কী আছে, সেটাও কেউ ঠিকমতো জানে না।

টেডের দাদি নর্মা তাকে এক রহস্যময় মানুষের কথা বলেন। লোকটির নাম ওয়ানস-লার। তিনি একসময় গাছভরা বনে থাকতেন। এখন শহরের বাইরে নির্জন এক জায়গায় একা বসবাস করেন। দাদির কাছ থেকে এসব শোনার পর টেডের কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। সে একদিন গোপনে শহরের দেয়াল পেরিয়ে বাইরে চলে যায়। সেখানে গিয়ে দেখতে পায় এক অদ্ভুত পরিবেশ। চারদিকে ধূসর মাটি, দূষিত বাতাস আর গাছপালাহীন বিস্তীর্ণ এলাকা।

সেই নির্জন জায়গাতেই তার দেখা হয় বৃদ্ধ ওয়ানস-লারের সঙ্গে। প্রথমে ওয়ানস-লার টেডকে তেমন পাত্তা দিতে চান না। তবে টেডের আগ্রহ দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি রাজি হন তার জীবনের গল্প শোনাতে। কিন্তু একটি শর্ত দেন। টেডকে প্রতিদিন তার কাছে আসতে হবে এবং প্রতিদিন নতুন কিছু জানতে হবে। টেডও রাজি হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় বহু বছর আগের এক বিস্ময়কর গল্প।

অনেক বছর আগে ওয়ানস-লার ছিলেন একজন তরুণ উদ্ভাবক। নতুন কিছু তৈরি করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন। একদিন তিনি পৌঁছে যান একটি সুন্দর বনে। সেই বনের নাম ট্রাফুলা বন। সেখানে ছিল অদ্ভুত সুন্দর সব গাছ। গাছগুলোর মাথায় তুলোর মতো নরম, রঙিন পাতা। দেখতে যেন বিশাল কোনো রঙিন ফুলের বাগান। বনে বাস করত নানা ধরনের প্রাণী। চারদিকে ছিল আনন্দ, ছিল জীবনের ছোঁয়া।

ওয়ানস-লার সেই গাছের নরম তন্তু দিয়ে একটি বিশেষ জিনিস তৈরি করেন। এর নাম দেন ‘থ্রিড’। এটি এমন এক ধরনের জিনিস, যা দিয়ে পোশাক, কম্বলসহ নানা কাজে ব্যবহার করা যায়। প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি, এই জিনিসের এত চাহিদা তৈরি হবে। কিন্তু বাজারে থ্রিড বিক্রি শুরু হতেই সবাই সেটি কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়ানস-লারের ব্যবসা জমে যায়।

ঠিক তখনই তার জীবনে হাজির হয় লরাক্স। ছোটখাটো, গোঁফওয়ালা, কমলা রঙের অদ্ভুত দেখতে এই প্রাণীটি নিজেকে বনের অভিভাবক বলে পরিচয় দেয়। সে কথা বলতে পারে এবং বনের গাছপালা ও প্রাণীদের হয়ে প্রতিবাদ করে। লরাক্স ওয়ানস-লারকে জানিয়ে দেয়, গাছ কেটে ব্যবসা করা যাবে না। সে তাকে প্রকৃতির ক্ষতি না করার প্রতিশ্রুতিও দিতে বলে। কিন্তু ব্যবসার লাভ যখন বাড়তে থাকে, তখন ওয়ানস-লারের চিন্তাভাবনাও বদলে যায়।

তার আত্মীয়স্বজন এসে ব্যবসা বড় করার পরামর্শ দেয়। আরও বেশি থ্রিড তৈরি করতে হলে আরও বেশি গাছ কাটতে হবে। ওয়ানস-লারও ধীরে ধীরে তাদের কথায় প্রভাবিত হন। একসময় বনের গাছ কেটে বড় কারখানা তৈরি করা হয়। উৎপাদন বাড়তে থাকে, কিন্তু কমতে থাকে গাছের সংখ্যা। কারখানার ধোঁয়ায় বাতাস দূষিত হয়। বনের প্রাণীরা তাদের আবাসস্থল হারিয়ে একে একে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হয়।

লরাক্স বারবার ওয়ানস-লারকে সতর্ক করলেও তিনি তখন আর কারো কথা শুনতে চান না। ব্যবসার নেশায় তিনি এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে, নিজের কাজের পরিণতি বুঝতে পারেন না। একসময় শেষ ট্রাফুলা গাছটিও কেটে ফেলা হয়। গাছ শেষ হয়ে যাওয়ায় থ্রিড তৈরির কাঁচামালও আর থাকে না। ফলে বন্ধ হয়ে যায় কারখানা। ব্যবসা হারিয়ে ওয়ানস-লার একা হয়ে পড়েন। তার পরিবারও তাকে ছেড়ে চলে যায়।

আর লরাক্স বনের অন্য প্রাণীদের সঙ্গে চলে যাওয়ার আগে একটি পাথরে লিখে রেখে যায় একটি শব্দ ‘টহষবংং’। এই একটি শব্দের অর্থ নিয়েই ওয়ানস-লার বহু বছর ধরে ভাবতে থাকেন। তিনি বুঝতে পারেন, প্রকৃতি ধ্বংসের পেছনে শুধু তার একার ভুল ছিল না, বরং সেই ভুলের জন্য দায় নেওয়ার দায়িত্বও তারই ছিল। এখন কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

এদিকে টেড নিয়মিত ওয়ানস-লারের কাছে যাওয়া-আসা করতে থাকে। বিষয়টি শহরের মেয়র ও’হায়ারের নজরে পড়ে। ও’হায়ার জানে, শহরে যদি আবার আসল গাছ জন্মায়, তাহলে মানুষ আর তার কাছ থেকে বোতলে ভরা বাতাস কিনবে না। ফলে তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সে কোনোভাবেই চায় না শহরে গাছ ফিরে আসুক। টেডকে থামানোর জন্য নানা রকম ভয় দেখাতে শুরু করে।

কিন্তু এবার ওয়ানস-লার নিজের ভুল শুধরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার কাছে যে শেষ ট্রাফুলা বীজটি রয়ে গেছে, সেটি তিনি টেডের হাতে তুলে দেন। বলেন, এই বীজটি যেন সে শহরে নিয়ে গিয়ে মাটিতে রোপণ করে। টেড বুঝতে পারে, এটি শুধু একটি বীজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো একটি বনের ভবিষ্যৎ। বীজ নিয়ে শহরে ফিরলেও টেডের কাজ সহজ হয় না। ও’হায়ার তার পথ আটকে দাঁড়ায়।

সে শহরের মানুষকে বোঝাতে থাকে, গাছ থাকলে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হবে, চারপাশ নোংরা হবে। কিন্তু টেড এবার আর ভয় পায় না। অড্রে, দাদি নর্মা ও মায়ের সহযোগিতায় সে শহরের মানুষের সামনে সত্যিটা তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেয়। একসময় টেড একটি বুলডোজার নিয়ে শহরের কৃত্রিম দেয়ালের একটি অংশ ভেঙে ফেলে। দেয়াল ভাঙার পর শহরের মানুষ প্রথমবার দেখতে পায় বাইরের পৃথিবীকে।

সেখানে কোনো রঙিন কৃত্রিম সাজসজ্জা নেই। আছে প্রকৃতি ধ্বংসের চিহ্ন, দূষিত পরিবেশ আর হারিয়ে যাওয়া এক বনের স্মৃতি। টেড সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করে, তারা নিজেরাই এমন একটি পৃথিবী তৈরি করেছে, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বাতাসটুকুও কিনে নিতে হয়। ধীরে ধীরে শহরের মানুষ টেডের কথার গুরুত্ব বুঝতে পারে। তারা ও’হায়ারের বিরোধিতা করে এবং শেষ পর্যন্ত সেই ট্রাফুলা বীজ মাটিতে রোপণ করা হয়।

শুরু হয় নতুন একটি সম্ভাবনার গল্প। ছোট্ট বীজ থেকে একসময় চারা গজায়। আবার গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকৃতির প্রতি মানুষের আগ্রহ ফিরে আসতে শুরু করে। আর এই পরিবর্তনের খবর পেয়ে বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া লরাক্সও ফিরে আসে। ওয়ানস-লারের সঙ্গে তার আবার দেখা হয়। পুরোনো বন্ধুত্বও ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সিনেমাটির শেষ অংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়।

পৃথিবীকে সুন্দর করার জন্য শুধু অন্য কারো উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। প্রত্যেকেরই নিজের জায়গা থেকে কিছু করার আছে। গাছ লাগানো, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা কিংবা অযথা প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট না করা, ছোট ছোট কাজও একসময় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। দ্য লরাক্স নির্মিত হয়েছে বিখ্যাত মার্কিন শিশুসাহিত্যিক ডক্টর সিউসের ১৯৭১ সালে প্রকাশিত একই নামের বই অবলম্বনে।

এর আগে ১৯৭২ সালে বইটি নিয়ে একটি অ্যানিমেটেড টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠান তৈরি হয়েছিল। ২০১২ সালের চলচ্চিত্রটি সেই গল্পের দ্বিতীয় পর্দারূপ। ছবিটি পরিচালনা করেছেন ক্রিস রেনোড। চিত্রনাট্য লিখেছেন সিনকো পল ও কেন ডৌরিয়া। প্রযোজনা করেছে ইউনিভার্সাল পিকচার্স ও ইলুমিনেশন এন্টারটেইনমেন্ট।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

সবুজহীন এক শহরের গল্প

Update Time : 02:51:29 am, Tuesday, 3 November 2026

এমন একটি শহরের কথা ভাবুন, যেখানে কোনো গাছ নেই। নেই পাখির ডাক, নেই পাতার মর্মর শব্দ, আর বৃষ্টির পর ভেজা মাটির গন্ধও অনুপস্থিত। চারপাশে কেবল রঙিন বাড়িঘর, প্লাস্টিকের ঘাস এবং কৃত্রিম গাছপালা। এমনকি নির্মল বাতাস পাওয়ার জন্যও সেখানকার বাসিন্দাদের টাকা খরচ করতে হয়।

শুনতে কেমন অদ্ভুত লাগছে, তাই না? এমনই এক শহরের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছিল ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া অ্যানিমেশন সিনেমা দ্য লরাক্স। গল্পের শুরু থিনিডভিল নামের একটি শহর থেকে। শহরটি দেখতে বেশ সুন্দর। বাড়িঘরগুলো রঙিন, রাস্তাঘাট ঝকঝকে। সবকিছুই যেন ছবির মতো সাজানো। কিন্তু এই শহরের একটি বড় সমস্যা আছে। এখানে কোনো আসল গাছ নেই। ঘাস থেকে শুরু করে ফুল, এমনকি গাছের পাতাও তৈরি করা হয়েছে প্লাস্টিক দিয়ে।

শহরের বাসিন্দারা কৃত্রিম গাছের সৌন্দর্য উপভোগ করলেও প্রকৃতির আসল রূপ সম্পর্কে তাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। বিশুদ্ধ বাতাসের জন্যও তাদের নির্ভর করতে হয় বোতলে ভরা বাতাসের ওপর। এই বাতাস বিক্রি করেই বেশ ভালো ব্যবসা করছে শহরের মেয়র অ্যালয়সিয়াস ও’হায়ার। এই শহরেই থাকে টেড উইগিন্স নামের বারো বছর বয়সি এক কিশোর। টেডের মা ও দাদি নর্মার সঙ্গে তার ছোট্ট সংসার।

টেডের পাশের বাড়িতে থাকে অড্রে নামের একটি মেয়ে। অড্রের খুব ইচ্ছা, সে একদিন সত্যিকারের একটি গাছ দেখবে। কারণ বইয়ে গাছের ছবি দেখলেও বাস্তবে গাছ কেমন, তা সে কখনো দেখেনি। অড্রের এই ইচ্ছার কথা শুনে টেডও ঠিক করে, যেভাবেই হোক তাকে একটি আসল গাছ এনে দেবে। কিন্তু সমস্যা হলো, গাছ তারা পাবে কোথায়? শহরের চারদিকে উঁচু দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে কী আছে, সেটাও কেউ ঠিকমতো জানে না।

টেডের দাদি নর্মা তাকে এক রহস্যময় মানুষের কথা বলেন। লোকটির নাম ওয়ানস-লার। তিনি একসময় গাছভরা বনে থাকতেন। এখন শহরের বাইরে নির্জন এক জায়গায় একা বসবাস করেন। দাদির কাছ থেকে এসব শোনার পর টেডের কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। সে একদিন গোপনে শহরের দেয়াল পেরিয়ে বাইরে চলে যায়। সেখানে গিয়ে দেখতে পায় এক অদ্ভুত পরিবেশ। চারদিকে ধূসর মাটি, দূষিত বাতাস আর গাছপালাহীন বিস্তীর্ণ এলাকা।

সেই নির্জন জায়গাতেই তার দেখা হয় বৃদ্ধ ওয়ানস-লারের সঙ্গে। প্রথমে ওয়ানস-লার টেডকে তেমন পাত্তা দিতে চান না। তবে টেডের আগ্রহ দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি রাজি হন তার জীবনের গল্প শোনাতে। কিন্তু একটি শর্ত দেন। টেডকে প্রতিদিন তার কাছে আসতে হবে এবং প্রতিদিন নতুন কিছু জানতে হবে। টেডও রাজি হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় বহু বছর আগের এক বিস্ময়কর গল্প।

অনেক বছর আগে ওয়ানস-লার ছিলেন একজন তরুণ উদ্ভাবক। নতুন কিছু তৈরি করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন। একদিন তিনি পৌঁছে যান একটি সুন্দর বনে। সেই বনের নাম ট্রাফুলা বন। সেখানে ছিল অদ্ভুত সুন্দর সব গাছ। গাছগুলোর মাথায় তুলোর মতো নরম, রঙিন পাতা। দেখতে যেন বিশাল কোনো রঙিন ফুলের বাগান। বনে বাস করত নানা ধরনের প্রাণী। চারদিকে ছিল আনন্দ, ছিল জীবনের ছোঁয়া।

ওয়ানস-লার সেই গাছের নরম তন্তু দিয়ে একটি বিশেষ জিনিস তৈরি করেন। এর নাম দেন ‘থ্রিড’। এটি এমন এক ধরনের জিনিস, যা দিয়ে পোশাক, কম্বলসহ নানা কাজে ব্যবহার করা যায়। প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি, এই জিনিসের এত চাহিদা তৈরি হবে। কিন্তু বাজারে থ্রিড বিক্রি শুরু হতেই সবাই সেটি কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়ানস-লারের ব্যবসা জমে যায়।

ঠিক তখনই তার জীবনে হাজির হয় লরাক্স। ছোটখাটো, গোঁফওয়ালা, কমলা রঙের অদ্ভুত দেখতে এই প্রাণীটি নিজেকে বনের অভিভাবক বলে পরিচয় দেয়। সে কথা বলতে পারে এবং বনের গাছপালা ও প্রাণীদের হয়ে প্রতিবাদ করে। লরাক্স ওয়ানস-লারকে জানিয়ে দেয়, গাছ কেটে ব্যবসা করা যাবে না। সে তাকে প্রকৃতির ক্ষতি না করার প্রতিশ্রুতিও দিতে বলে। কিন্তু ব্যবসার লাভ যখন বাড়তে থাকে, তখন ওয়ানস-লারের চিন্তাভাবনাও বদলে যায়।

তার আত্মীয়স্বজন এসে ব্যবসা বড় করার পরামর্শ দেয়। আরও বেশি থ্রিড তৈরি করতে হলে আরও বেশি গাছ কাটতে হবে। ওয়ানস-লারও ধীরে ধীরে তাদের কথায় প্রভাবিত হন। একসময় বনের গাছ কেটে বড় কারখানা তৈরি করা হয়। উৎপাদন বাড়তে থাকে, কিন্তু কমতে থাকে গাছের সংখ্যা। কারখানার ধোঁয়ায় বাতাস দূষিত হয়। বনের প্রাণীরা তাদের আবাসস্থল হারিয়ে একে একে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হয়।

লরাক্স বারবার ওয়ানস-লারকে সতর্ক করলেও তিনি তখন আর কারো কথা শুনতে চান না। ব্যবসার নেশায় তিনি এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে, নিজের কাজের পরিণতি বুঝতে পারেন না। একসময় শেষ ট্রাফুলা গাছটিও কেটে ফেলা হয়। গাছ শেষ হয়ে যাওয়ায় থ্রিড তৈরির কাঁচামালও আর থাকে না। ফলে বন্ধ হয়ে যায় কারখানা। ব্যবসা হারিয়ে ওয়ানস-লার একা হয়ে পড়েন। তার পরিবারও তাকে ছেড়ে চলে যায়।

আর লরাক্স বনের অন্য প্রাণীদের সঙ্গে চলে যাওয়ার আগে একটি পাথরে লিখে রেখে যায় একটি শব্দ ‘টহষবংং’। এই একটি শব্দের অর্থ নিয়েই ওয়ানস-লার বহু বছর ধরে ভাবতে থাকেন। তিনি বুঝতে পারেন, প্রকৃতি ধ্বংসের পেছনে শুধু তার একার ভুল ছিল না, বরং সেই ভুলের জন্য দায় নেওয়ার দায়িত্বও তারই ছিল। এখন কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

এদিকে টেড নিয়মিত ওয়ানস-লারের কাছে যাওয়া-আসা করতে থাকে। বিষয়টি শহরের মেয়র ও’হায়ারের নজরে পড়ে। ও’হায়ার জানে, শহরে যদি আবার আসল গাছ জন্মায়, তাহলে মানুষ আর তার কাছ থেকে বোতলে ভরা বাতাস কিনবে না। ফলে তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সে কোনোভাবেই চায় না শহরে গাছ ফিরে আসুক। টেডকে থামানোর জন্য নানা রকম ভয় দেখাতে শুরু করে।

কিন্তু এবার ওয়ানস-লার নিজের ভুল শুধরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার কাছে যে শেষ ট্রাফুলা বীজটি রয়ে গেছে, সেটি তিনি টেডের হাতে তুলে দেন। বলেন, এই বীজটি যেন সে শহরে নিয়ে গিয়ে মাটিতে রোপণ করে। টেড বুঝতে পারে, এটি শুধু একটি বীজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো একটি বনের ভবিষ্যৎ। বীজ নিয়ে শহরে ফিরলেও টেডের কাজ সহজ হয় না। ও’হায়ার তার পথ আটকে দাঁড়ায়।

সে শহরের মানুষকে বোঝাতে থাকে, গাছ থাকলে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হবে, চারপাশ নোংরা হবে। কিন্তু টেড এবার আর ভয় পায় না। অড্রে, দাদি নর্মা ও মায়ের সহযোগিতায় সে শহরের মানুষের সামনে সত্যিটা তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেয়। একসময় টেড একটি বুলডোজার নিয়ে শহরের কৃত্রিম দেয়ালের একটি অংশ ভেঙে ফেলে। দেয়াল ভাঙার পর শহরের মানুষ প্রথমবার দেখতে পায় বাইরের পৃথিবীকে।

সেখানে কোনো রঙিন কৃত্রিম সাজসজ্জা নেই। আছে প্রকৃতি ধ্বংসের চিহ্ন, দূষিত পরিবেশ আর হারিয়ে যাওয়া এক বনের স্মৃতি। টেড সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করে, তারা নিজেরাই এমন একটি পৃথিবী তৈরি করেছে, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বাতাসটুকুও কিনে নিতে হয়। ধীরে ধীরে শহরের মানুষ টেডের কথার গুরুত্ব বুঝতে পারে। তারা ও’হায়ারের বিরোধিতা করে এবং শেষ পর্যন্ত সেই ট্রাফুলা বীজ মাটিতে রোপণ করা হয়।

শুরু হয় নতুন একটি সম্ভাবনার গল্প। ছোট্ট বীজ থেকে একসময় চারা গজায়। আবার গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকৃতির প্রতি মানুষের আগ্রহ ফিরে আসতে শুরু করে। আর এই পরিবর্তনের খবর পেয়ে বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া লরাক্সও ফিরে আসে। ওয়ানস-লারের সঙ্গে তার আবার দেখা হয়। পুরোনো বন্ধুত্বও ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সিনেমাটির শেষ অংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়।

পৃথিবীকে সুন্দর করার জন্য শুধু অন্য কারো উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। প্রত্যেকেরই নিজের জায়গা থেকে কিছু করার আছে। গাছ লাগানো, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা কিংবা অযথা প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট না করা, ছোট ছোট কাজও একসময় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। দ্য লরাক্স নির্মিত হয়েছে বিখ্যাত মার্কিন শিশুসাহিত্যিক ডক্টর সিউসের ১৯৭১ সালে প্রকাশিত একই নামের বই অবলম্বনে।

এর আগে ১৯৭২ সালে বইটি নিয়ে একটি অ্যানিমেটেড টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠান তৈরি হয়েছিল। ২০১২ সালের চলচ্চিত্রটি সেই গল্পের দ্বিতীয় পর্দারূপ। ছবিটি পরিচালনা করেছেন ক্রিস রেনোড। চিত্রনাট্য লিখেছেন সিনকো পল ও কেন ডৌরিয়া। প্রযোজনা করেছে ইউনিভার্সাল পিকচার্স ও ইলুমিনেশন এন্টারটেইনমেন্ট।