7:25 am, Wednesday, 23 September 2026

সহিংসতার নেপথ্যে কি ভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা?

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বর্তমানে এক অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং ঐতিহাসিক মোড় অতিক্রম করছে। এই অবস্থায়, বিগত পতিত ও পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত শতাধিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান বিএনপি সরকার।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ঠিক এর পরপরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নয়াদিল্লিতে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়ে নয়াদিল্লি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বার্তা না পেলেও ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যা যা করণীয়, ভারত সরকার তার সবটুকু পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

নয়াদিল্লির এই কঠোর ও কৌশলী বার্তার পরই হঠাৎ করে রাজধানী ঢাকায় রহস্যজনক সহিংসতা, একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়া কোনো অসংলগ্ন বা বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। এই সংঘাত এমন একসময়ে ঘটছে, যখন দেশের মূলধারার সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক সংঘাত নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ করে কেন এই বোমাবাজি ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে।

দিল্লি কি তবে নিজস্ব আধিপত্য ও স্বার্থ বজায় রাখতে তাদের চিরাচরিত চাণক্য কূটনীতির চাল চালছে এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ ও এদেশীয় দোসরদের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ছক আঁকছে? দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভারতের চাণক্য কৌশলের নির্মম সত্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভারত কোনোভাবেই বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল, সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্রকাঠামো সহজে মেনে নিতে চায় না।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি রচিত হয়েছে প্রাচীন কূটনীতিবিদ চাণক্যের দর্শন এবং প্রতিবেশীকে কখনোই পূর্ণাঙ্গ স্থিতিশীল বা স্বাবলম্বী হতে না দেওয়ার কৌশলের ওপর। চাণক্য কূটনীতির মূল ভাবনাই হলোÑ প্রতিবেশীর অভ্যন্তরে দুর্বলতা, অস্থিতিশীলতা ও বিভাজন বজায় রেখে নিজের একক আধিপত্য কায়েম রাখা। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত বাংলাদেশকে তাদের কৌশলগত অনুগত অঙ্গরাজ্যের মতো ব্যবহার করেছিল।

ট্রানজিট, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার, করিডোর, নদী নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি খাতসহ প্রায় ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে ভারতের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে একতরফাভাবে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। আজ যখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সে জাতীয় স্বার্থবিরোধী ও অসম চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন বা বাতিলের সাহস দেখাচ্ছে, তখন দিল্লির চাণক্য শক্তি চটে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের জাতীয় স্বার্থে যা করণীয় তা-ই করা হবেÑ এমন উক্তির আড়ালে যে প্রচ্ছন্ন হুমকিসূচক বার্তা রয়েছে, ঢাকার রাজপথের বর্তমান ককটেল বিস্ফোরণ তারই বাস্তব প্রয়োগ বলে মনে করার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। ভারতকে বুঝতে হবে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জনগণ কোনো দাসত্ব মেনে নেবে না।

চাণক্য কূটনীতির নামে বাংলাদেশকে চেপে রাখার এই মানসিকতা ভাঙতে হলে দেশের সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং সরকারকে বীরত্বের সঙ্গে সাহসিকতা প্রদর্শন করে লড়াই করতে হবে। তবেই ভারতের এই সাম্রাজ্যবাদী কূটনীতির বিষাক্ত মুখোশ চিরতরে উন্মোচিত হবে।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মালিবাগ, মহাখালী, আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী, মগবাজার, বাবুবাজার, বঙ্গবাজার, সায়েন্সল্যাব, গুলিস্তান ও বিটিভি ভবনের মূল ফটকের সামনে ঘটে যাওয়া একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ এবং কাফরুল, কলেজগেট ও চট্টগ্রাম হাইওয়ে রোডে দূরপাল্লার বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলো মূলত আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করার লক্ষ্যেই ঘটানো হয়েছে। আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে সরকারি ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজপথ দখলের সহিংস লড়াই নেই, সেখানে হঠাৎ বাসে আগুন ও বোমাবাজির নেপথ্য কারিগরদের উদ্দেশে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

চুক্তি পর্যালোচনার খবরের সঙ্গেই এই সহিংসতার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে, যা মূলত একটি নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক মহলকে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে ব্যর্থ। পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে ভারত বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু ও অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে চায়।

সহিংসতার এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও বিপজ্জনক মাত্রা যোগ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের একটি অংশ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানের একটি চাঞ্চল্যকর অডিও ফাঁস পুরো পুলিশ প্রশাসনের কঙ্কালসার ও চরম বিতর্কিত চিত্র উন্মোচিত করেছে।

ফাঁস হওয়া সেই অডিওতে এক ওসির মুখে যে ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ও চরম শৃঙ্খলাবিরোধী কথা শোনা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। আমার একাধিক আর্টিকেলে বহুবার বলেছি, পুলিশের নিয়োগ ও পদায়ন-বাণিজ্য বন্ধ করা না গেলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যে চরম হুমকির মুখে পড়বে, সে বিষয়ে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তা গুরুত্ব পায়নি।

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের আমলে থানাভেদে ওসির পদায়নের জন্য ১ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হতো এবং কোটি টাকার নিচে কোনো ভালো থানায় পোস্টিং পাওয়া যেত না। ঘুষ ও বাণিজ্যের বিনিময়ে পদ পাওয়া এসব কর্মকর্তা কোনোদিন দেশের সেবা বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে না, তারা কেবল নিজেদের বিনিয়োগ করা টাকা সুদে-আসলে তুলতে এবং অপরাধীদের ছায়া দিতে ব্যস্ত থাকে।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির অডিওতে উন্মোচিত হয়েছে কীভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাড়িচালকরা পর্যন্ত কোটি টাকার পদায়ন সিন্ডিকেট চালায়। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, পলাতক শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বিষয়ে অডিওতে ওই ওসি উস্কানি দিয়ে বলেছিলেন যে এই মাসেই চলে আসা উচিত এবং পুলিশ কিছুই করতে পারবে না। সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভাঙতে এবং পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের চাঙ্গা করতেই এই অডিও চক্রান্তমূলকভাবে ছড়ানো হয়েছে।

রাকিবুল হাসান আরও নির্লজ্জের মতো দাবি করেছেন যে আওয়ামী লীগ আমলে নাকি ওসি বদলিতে টাকা লাগেনি এবং গুম-খুন ও ব্যাংক লুটের দায়ে অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সাফাই গেয়েছেন। এই ভিত্তিহীন মিথ্যাচারই প্রমাণ করে যে তিনি এবং তার মতো প্রশাসনের গভীরে বসে থাকা চক্রগুলো এখনো সরাসরি আওয়ামী লীগ ও তাদের ভারতীয় প্রভুদের প্রেসক্রিপশনে কাজ করছে।

রাজধানীর গুলশানে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, ক্যান্টনমেন্ট ওসির অডিও এবং রাজপথে বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণÑ এসবের কিছুই বিচ্ছিন্ন নয়, বরং সবই এক সূত্রে গাঁথা চক্রান্তের অংশ বলেই মনে হচ্ছে। তবে এখানে আমি এটাও বলতে চাই যে, ফ্যাসিবাদের দোসরদের এই অলীক স্বপ্ন মূলত এক ধরনের প্রলাপ ছাড়া কিছুই নয়।

শেখ হাসিনা নিজেই তার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতে দেশে ফেরার বিষয়ে ঘোর সন্দেহ প্রকাশ করে স্বীকার করেছেন যে, তিনি দেশে ফিরলে ব্যাপক প্রাণহানি হতে পারে। এটি স্পষ্ট যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গল্পটি কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আশ্বস্ত রাখার একটি ফাঁকা বুলি ও রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি। জুলাই অভ্যুত্থানে নির্বিচারে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ও শিশুদের হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে পঙ্গু করার দায়ে অভিযুক্ত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পুনর্বাসনের আর কোনো সুযোগ বাংলাদেশে নেই।

আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এখন আর শেখ হাসিনা বা ভারতের একচেটিয়া অনুকূলে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছেন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও বর্তমান সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিন্তু এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না চাণক্য কূটনীতির পুরোধারা, তাই তারা প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে থাকা নিজেদের এজেন্টদের সক্রিয় করে দেশে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরিতে উস্কানি দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই চাণক্য ষড়যন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ নাশকতামূলক তৎপরতা মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের কৌশল কী হওয়া উচিত। বহুল প্রচলিত প্রবাদ ‘সরষের ভেতরেই যদি ভূত থাকে, তবে সেই ভূত তাড়াবে কে?

’Ñএর মতোই আজ প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আমলাতন্ত্র ও পুলিশ বাহিনীতে লুকিয়ে থাকা স্বৈরাচারের চিহ্নিত দোসরদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে এক ব্যাপকভিত্তিক ও কঠোর প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। এখনো বহু স্পর্শকাতর পদে আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী ও চক্রান্তকারী কর্মকর্তা বসে আছেন, যারা রাষ্ট্রের সংবেদনশীল তথ্য বিদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও পলাতক নেতাদের কাছে পাচার করছেন।

তাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে বরখাস্ত ও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন সিভিল ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ডিভাইস, মোবাইল সংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকা- কঠোর নজরদারিতে আনা জরুরি। ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরে যেসব কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন, দুদকের মাধ্যমে তাদের সম্পদ অনুসন্ধান করে দ্রুত রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করতে হবে।

একই সঙ্গে ভারতের যেকোনো ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক উস্কানি বীরত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে এবং ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটা চলবে না। পরিশেষে বলতে চাই, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রেখে সরকারকেও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ তার আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেমেছে।

এই লড়াইয়ে ভারতের চাণক্য কূটনীতি ও তাদের এদেশীয় দোসরদের ষড়যন্ত্র তীব্র হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু জনগণের ঐক্যবদ্ধ দেশপ্রেম, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে এই চক্রান্ত ভেস্তে দিতে হবে। তবেই চিরতরে চাণক্য কূটনীতির ষড়যন্ত্রের মুখোশ খসে পড়বে এবং বাংলাদেশ এক স্বাধীন, স্বাবলম্বী ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

রক্তাক্ত আইফোন ও একটি নিথর স্বপ্ন: ক্ষমা করো অপ্রতিম

সহিংসতার নেপথ্যে কি ভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা?

Update Time : 06:12:35 am, Wednesday, 23 September 2026

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বর্তমানে এক অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং ঐতিহাসিক মোড় অতিক্রম করছে। এই অবস্থায়, বিগত পতিত ও পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত শতাধিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান বিএনপি সরকার।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ঠিক এর পরপরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নয়াদিল্লিতে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়ে নয়াদিল্লি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বার্তা না পেলেও ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যা যা করণীয়, ভারত সরকার তার সবটুকু পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

নয়াদিল্লির এই কঠোর ও কৌশলী বার্তার পরই হঠাৎ করে রাজধানী ঢাকায় রহস্যজনক সহিংসতা, একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়া কোনো অসংলগ্ন বা বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। এই সংঘাত এমন একসময়ে ঘটছে, যখন দেশের মূলধারার সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক সংঘাত নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ করে কেন এই বোমাবাজি ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে।

দিল্লি কি তবে নিজস্ব আধিপত্য ও স্বার্থ বজায় রাখতে তাদের চিরাচরিত চাণক্য কূটনীতির চাল চালছে এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ ও এদেশীয় দোসরদের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ছক আঁকছে? দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভারতের চাণক্য কৌশলের নির্মম সত্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভারত কোনোভাবেই বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল, সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্রকাঠামো সহজে মেনে নিতে চায় না।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি রচিত হয়েছে প্রাচীন কূটনীতিবিদ চাণক্যের দর্শন এবং প্রতিবেশীকে কখনোই পূর্ণাঙ্গ স্থিতিশীল বা স্বাবলম্বী হতে না দেওয়ার কৌশলের ওপর। চাণক্য কূটনীতির মূল ভাবনাই হলোÑ প্রতিবেশীর অভ্যন্তরে দুর্বলতা, অস্থিতিশীলতা ও বিভাজন বজায় রেখে নিজের একক আধিপত্য কায়েম রাখা। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত বাংলাদেশকে তাদের কৌশলগত অনুগত অঙ্গরাজ্যের মতো ব্যবহার করেছিল।

ট্রানজিট, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার, করিডোর, নদী নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি খাতসহ প্রায় ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে ভারতের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে একতরফাভাবে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। আজ যখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সে জাতীয় স্বার্থবিরোধী ও অসম চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন বা বাতিলের সাহস দেখাচ্ছে, তখন দিল্লির চাণক্য শক্তি চটে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের জাতীয় স্বার্থে যা করণীয় তা-ই করা হবেÑ এমন উক্তির আড়ালে যে প্রচ্ছন্ন হুমকিসূচক বার্তা রয়েছে, ঢাকার রাজপথের বর্তমান ককটেল বিস্ফোরণ তারই বাস্তব প্রয়োগ বলে মনে করার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। ভারতকে বুঝতে হবে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জনগণ কোনো দাসত্ব মেনে নেবে না।

চাণক্য কূটনীতির নামে বাংলাদেশকে চেপে রাখার এই মানসিকতা ভাঙতে হলে দেশের সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং সরকারকে বীরত্বের সঙ্গে সাহসিকতা প্রদর্শন করে লড়াই করতে হবে। তবেই ভারতের এই সাম্রাজ্যবাদী কূটনীতির বিষাক্ত মুখোশ চিরতরে উন্মোচিত হবে।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মালিবাগ, মহাখালী, আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী, মগবাজার, বাবুবাজার, বঙ্গবাজার, সায়েন্সল্যাব, গুলিস্তান ও বিটিভি ভবনের মূল ফটকের সামনে ঘটে যাওয়া একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ এবং কাফরুল, কলেজগেট ও চট্টগ্রাম হাইওয়ে রোডে দূরপাল্লার বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলো মূলত আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করার লক্ষ্যেই ঘটানো হয়েছে। আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে সরকারি ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজপথ দখলের সহিংস লড়াই নেই, সেখানে হঠাৎ বাসে আগুন ও বোমাবাজির নেপথ্য কারিগরদের উদ্দেশে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

চুক্তি পর্যালোচনার খবরের সঙ্গেই এই সহিংসতার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে, যা মূলত একটি নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক মহলকে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে ব্যর্থ। পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে ভারত বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু ও অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে চায়।

সহিংসতার এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও বিপজ্জনক মাত্রা যোগ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের একটি অংশ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানের একটি চাঞ্চল্যকর অডিও ফাঁস পুরো পুলিশ প্রশাসনের কঙ্কালসার ও চরম বিতর্কিত চিত্র উন্মোচিত করেছে।

ফাঁস হওয়া সেই অডিওতে এক ওসির মুখে যে ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ও চরম শৃঙ্খলাবিরোধী কথা শোনা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। আমার একাধিক আর্টিকেলে বহুবার বলেছি, পুলিশের নিয়োগ ও পদায়ন-বাণিজ্য বন্ধ করা না গেলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যে চরম হুমকির মুখে পড়বে, সে বিষয়ে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তা গুরুত্ব পায়নি।

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের আমলে থানাভেদে ওসির পদায়নের জন্য ১ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হতো এবং কোটি টাকার নিচে কোনো ভালো থানায় পোস্টিং পাওয়া যেত না। ঘুষ ও বাণিজ্যের বিনিময়ে পদ পাওয়া এসব কর্মকর্তা কোনোদিন দেশের সেবা বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে না, তারা কেবল নিজেদের বিনিয়োগ করা টাকা সুদে-আসলে তুলতে এবং অপরাধীদের ছায়া দিতে ব্যস্ত থাকে।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির অডিওতে উন্মোচিত হয়েছে কীভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাড়িচালকরা পর্যন্ত কোটি টাকার পদায়ন সিন্ডিকেট চালায়। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, পলাতক শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বিষয়ে অডিওতে ওই ওসি উস্কানি দিয়ে বলেছিলেন যে এই মাসেই চলে আসা উচিত এবং পুলিশ কিছুই করতে পারবে না। সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভাঙতে এবং পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের চাঙ্গা করতেই এই অডিও চক্রান্তমূলকভাবে ছড়ানো হয়েছে।

রাকিবুল হাসান আরও নির্লজ্জের মতো দাবি করেছেন যে আওয়ামী লীগ আমলে নাকি ওসি বদলিতে টাকা লাগেনি এবং গুম-খুন ও ব্যাংক লুটের দায়ে অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সাফাই গেয়েছেন। এই ভিত্তিহীন মিথ্যাচারই প্রমাণ করে যে তিনি এবং তার মতো প্রশাসনের গভীরে বসে থাকা চক্রগুলো এখনো সরাসরি আওয়ামী লীগ ও তাদের ভারতীয় প্রভুদের প্রেসক্রিপশনে কাজ করছে।

রাজধানীর গুলশানে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, ক্যান্টনমেন্ট ওসির অডিও এবং রাজপথে বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণÑ এসবের কিছুই বিচ্ছিন্ন নয়, বরং সবই এক সূত্রে গাঁথা চক্রান্তের অংশ বলেই মনে হচ্ছে। তবে এখানে আমি এটাও বলতে চাই যে, ফ্যাসিবাদের দোসরদের এই অলীক স্বপ্ন মূলত এক ধরনের প্রলাপ ছাড়া কিছুই নয়।

শেখ হাসিনা নিজেই তার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতে দেশে ফেরার বিষয়ে ঘোর সন্দেহ প্রকাশ করে স্বীকার করেছেন যে, তিনি দেশে ফিরলে ব্যাপক প্রাণহানি হতে পারে। এটি স্পষ্ট যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গল্পটি কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আশ্বস্ত রাখার একটি ফাঁকা বুলি ও রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি। জুলাই অভ্যুত্থানে নির্বিচারে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ও শিশুদের হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে পঙ্গু করার দায়ে অভিযুক্ত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পুনর্বাসনের আর কোনো সুযোগ বাংলাদেশে নেই।

আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এখন আর শেখ হাসিনা বা ভারতের একচেটিয়া অনুকূলে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছেন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও বর্তমান সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিন্তু এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না চাণক্য কূটনীতির পুরোধারা, তাই তারা প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে থাকা নিজেদের এজেন্টদের সক্রিয় করে দেশে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরিতে উস্কানি দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই চাণক্য ষড়যন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ নাশকতামূলক তৎপরতা মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের কৌশল কী হওয়া উচিত। বহুল প্রচলিত প্রবাদ ‘সরষের ভেতরেই যদি ভূত থাকে, তবে সেই ভূত তাড়াবে কে?

’Ñএর মতোই আজ প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আমলাতন্ত্র ও পুলিশ বাহিনীতে লুকিয়ে থাকা স্বৈরাচারের চিহ্নিত দোসরদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে এক ব্যাপকভিত্তিক ও কঠোর প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। এখনো বহু স্পর্শকাতর পদে আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী ও চক্রান্তকারী কর্মকর্তা বসে আছেন, যারা রাষ্ট্রের সংবেদনশীল তথ্য বিদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও পলাতক নেতাদের কাছে পাচার করছেন।

তাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে বরখাস্ত ও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন সিভিল ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ডিভাইস, মোবাইল সংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকা- কঠোর নজরদারিতে আনা জরুরি। ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরে যেসব কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন, দুদকের মাধ্যমে তাদের সম্পদ অনুসন্ধান করে দ্রুত রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করতে হবে।

একই সঙ্গে ভারতের যেকোনো ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক উস্কানি বীরত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে এবং ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটা চলবে না। পরিশেষে বলতে চাই, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রেখে সরকারকেও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ তার আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেমেছে।

এই লড়াইয়ে ভারতের চাণক্য কূটনীতি ও তাদের এদেশীয় দোসরদের ষড়যন্ত্র তীব্র হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু জনগণের ঐক্যবদ্ধ দেশপ্রেম, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে এই চক্রান্ত ভেস্তে দিতে হবে। তবেই চিরতরে চাণক্য কূটনীতির ষড়যন্ত্রের মুখোশ খসে পড়বে এবং বাংলাদেশ এক স্বাধীন, স্বাবলম্বী ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ।