4:03 am, Thursday, 8 October 2026

যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে হাম, নিউইয়র্কে জরুরি অবস্থা জারি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে হাম। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত দেশটির ৪৭টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) নিউইয়র্কে ১০৯টি নতুন শনাক্ত হওয়ার পর অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর ক্যাথি হোকুল জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।

চলতি বছর নিউইয়র্কে ১০৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে, যা ২০১৯ সালের প্রাদুর্ভাবের পর অঙ্গরাজ্যটিতে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, গত তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে পেনসিলভানিয়া। চলতি সপ্তাহে অঙ্গরাজ্যটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। পেনসিলভানিয়ায় হামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ।

তবে এ সংখ্যা নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতপার্থক্য রয়েছে। কেন্দ্রীয় কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত দুটি মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র গত আগস্টে পেনসিলভানিয়ায় হামে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে ‘বানোয়াট’ বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে এসব মৃত্যুর হিসাব করার পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রকে (সিডিসি) নির্দেশ দেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক বছরে মূলত টিকা না নেওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে হামের সংক্রমণ দ্রুত বেড়েছে। টিকা নেওয়ার ব্যাপারে অনীহা এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় শিশুদের টিকাদানের হার কমেছে। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু ও কিশোর। যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসে প্রায় ১ হাজার মানুষ আক্রান্ত হন। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ইউটাহতে চলমান প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত ৭২৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সিডিসি জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে।

এরই মধ্যে টেক্সাস, দক্ষিণ ক্যারোলাইনা, ভার্জিনিয়া, কানসাস, নিউ মেক্সিকো ও উইসকনসিনে মহামারি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে নিউইয়র্কেও মহামারি বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পাঠানোর প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ওই মুখপাত্র বলেন, স্বাস্থ্য সচিব কেনেডি নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ এবং সিডিসির পূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন।

প্রয়োজনীয় যেকোনো সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দলগুলো প্রস্তুত রয়েছে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এতে উচ্চ জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল ও পানিপড়া দেখা দিতে পারে। গুরুতর হলে এ রোগে মস্তিষ্কে প্রদাহ, নিউমোনিয়া এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

আক্রান্ত ব্যক্তির নিঃসৃত ভাইরাসযুক্ত ক্ষুদ্র কণা বাতাসে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। বিভিন্ন পৃষ্ঠও এসব ভাইরাস দ্বারা দূষিত হতে পারে। হাম বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধী এমএমআর টিকার দুটি ডোজ গ্রহণ করলে হামের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা পাওয়া যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ১০টি অঙ্গরাজ্যে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের হাম প্রতিরোধী টিকা নেওয়ার হার ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

রোগের বিস্তার ঠেকাতে ৯৫ শতাংশ টিকাদানের হারকে প্রয়োজনীয় মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু অনেক অঙ্গরাজ্যে এই হার ৯০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। অধিকাংশ মার্কিন নাগরিককে টিকা দেওয়ার পর ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হাম নির্মূল হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে বোস্টনের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছর দেশটি হাম নির্মূলের সেই মর্যাদা হারাতে পারে।

হাম নির্মূলের মর্যাদা বলতে বোঝায়, কোনো দেশে টানা এক বছরের বেশি সময় ধরে রোগটির স্থানীয় সংক্রমণ না থাকা। গবেষকেরা মে মাসে প্রকাশিত এক চিঠিতে সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে অব্যাহতির হার কমানো এবং চলমান স্থানীয় সংক্রমণ বন্ধ করা জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

আজ মধ্যরাত থেকে ইলিশ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু

যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে হাম, নিউইয়র্কে জরুরি অবস্থা জারি

Update Time : 02:45:57 am, Thursday, 8 October 2026

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে হাম। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত দেশটির ৪৭টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) নিউইয়র্কে ১০৯টি নতুন শনাক্ত হওয়ার পর অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর ক্যাথি হোকুল জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।

চলতি বছর নিউইয়র্কে ১০৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে, যা ২০১৯ সালের প্রাদুর্ভাবের পর অঙ্গরাজ্যটিতে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, গত তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে পেনসিলভানিয়া। চলতি সপ্তাহে অঙ্গরাজ্যটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। পেনসিলভানিয়ায় হামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ।

তবে এ সংখ্যা নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতপার্থক্য রয়েছে। কেন্দ্রীয় কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত দুটি মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র গত আগস্টে পেনসিলভানিয়ায় হামে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে ‘বানোয়াট’ বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে এসব মৃত্যুর হিসাব করার পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রকে (সিডিসি) নির্দেশ দেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক বছরে মূলত টিকা না নেওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে হামের সংক্রমণ দ্রুত বেড়েছে। টিকা নেওয়ার ব্যাপারে অনীহা এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় শিশুদের টিকাদানের হার কমেছে। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু ও কিশোর। যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসে প্রায় ১ হাজার মানুষ আক্রান্ত হন। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ইউটাহতে চলমান প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত ৭২৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সিডিসি জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে।

এরই মধ্যে টেক্সাস, দক্ষিণ ক্যারোলাইনা, ভার্জিনিয়া, কানসাস, নিউ মেক্সিকো ও উইসকনসিনে মহামারি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে নিউইয়র্কেও মহামারি বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পাঠানোর প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ওই মুখপাত্র বলেন, স্বাস্থ্য সচিব কেনেডি নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ এবং সিডিসির পূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন।

প্রয়োজনীয় যেকোনো সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দলগুলো প্রস্তুত রয়েছে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এতে উচ্চ জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল ও পানিপড়া দেখা দিতে পারে। গুরুতর হলে এ রোগে মস্তিষ্কে প্রদাহ, নিউমোনিয়া এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

আক্রান্ত ব্যক্তির নিঃসৃত ভাইরাসযুক্ত ক্ষুদ্র কণা বাতাসে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। বিভিন্ন পৃষ্ঠও এসব ভাইরাস দ্বারা দূষিত হতে পারে। হাম বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধী এমএমআর টিকার দুটি ডোজ গ্রহণ করলে হামের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা পাওয়া যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ১০টি অঙ্গরাজ্যে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের হাম প্রতিরোধী টিকা নেওয়ার হার ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

রোগের বিস্তার ঠেকাতে ৯৫ শতাংশ টিকাদানের হারকে প্রয়োজনীয় মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু অনেক অঙ্গরাজ্যে এই হার ৯০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। অধিকাংশ মার্কিন নাগরিককে টিকা দেওয়ার পর ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হাম নির্মূল হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে বোস্টনের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছর দেশটি হাম নির্মূলের সেই মর্যাদা হারাতে পারে।

হাম নির্মূলের মর্যাদা বলতে বোঝায়, কোনো দেশে টানা এক বছরের বেশি সময় ধরে রোগটির স্থানীয় সংক্রমণ না থাকা। গবেষকেরা মে মাসে প্রকাশিত এক চিঠিতে সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে অব্যাহতির হার কমানো এবং চলমান স্থানীয় সংক্রমণ বন্ধ করা জরুরি।