বর্তমান পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে ঢাকা ও টোকিও কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সাপ্লাই চেইন সংকট এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মুখোমুখি হয়ে দুই বন্ধুপ্রতিম দেশ তাদের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সম্পর্ককে আরও সুসংহত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে এশীয় প্রবৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্রে রূপ নেওয়ার জন্য এই অংশীদারিত্ব এক মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে। বিশ্ব বাস্তবতার মধ্যে নিজেদের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে বিশেষ অংশীদারিত্বমূলক উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) নতুন আঙ্গিকে এগিয়ে নেওয়ার দ্বিপাক্ষিক অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে জাপান ও বাংলাদেশ।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন, লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক সুসংহত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে প্রবর্তিত এই মেগা উদ্যোগকে এবার ‘যৌথ সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ (ইওএ-ই ভড়ৎ ঝযধৎবফ চৎড়ংঢ়বৎরঃু) কাঠামোর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলোÑ বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে একটি কৌশলগত শিল্প ও বাণিজ্য অর্থনৈতিক বলয়ে রূপান্তর করা।
বাংলাদেশের শিল্প রূপান্তর ও অবকাঠামো বিকাশে গতি আনতে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন) বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি ও বাস্তবায়নের বিশেষ পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে টোকিও। এই বিপুল বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশের জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন খাত, টেক্সটাইল, লজিস্টিকস ও অটোমোবাইল শিল্পে নতুন গতির সঞ্চার করবে।
একই সঙ্গে এটি দেশে প্রায় ২ লক্ষাধিক উচ্চদক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম মূল অগ্রাধিকার স্তম্ভ হলোÑ সর্বাধুনিক অবকাঠামো ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ অঞ্চলে একটি সমন্বিত শিল্প ও লজিস্টিক হাব গড়ে তোলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশকে সরাসরি যুক্ত করার কাজ চলছে।
পরিবহন ব্যবস্থার এই অভূতপূর্ব উন্নয়ন দেশীয় শিল্প পণ্যের আনয়ন-নয়ন খরচ বহুগুণ কমিয়ে আনবে এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক এন্ট্রি পয়েন্টে রূপান্তর করবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চয়তাসহ ভূ-রাজনৈতিক বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য জাপান যৌথভাবে অবকাঠামোগত স্থায়িত্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সার্বিক শান্তি, আঞ্চলিক স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠায় এবং মুক্ত সামুদ্রিক বাণিজ্য রুট সুরক্ষায় নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সীমানা রক্ষা, জলদস্যুতা প্রতিরোধ এবং বন্দর সুরক্ষায় জাপান বাংলাদেশকে বিশেষ টহল জাহাজ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দিয়ে আসছে। আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক টানা-পোড়েনের মধ্যে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মান্য করে সমুদ্র বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা দুই দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের অংশ।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ‘বিগ-বি’ প্রকল্পের সবচেয়ে মূল ও কৌশলগত স্তম্ভ। এই গভীর সমুদ্রবন্দর চালুর মাধ্যমে বড় মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি বাংলাদেশে নোঙর করার সুযোগ পাবে, যা সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দরের ওপর নির্ভরশীলতা কমাবে। বন্দরটিকে ঘিরে জ্বালানি হাব, বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সামুদ্রিক অর্থনীতির এক বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হচ্ছে।
যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩য় টার্মিনাল দ্রুত চালুকরণ এবং মেট্রোরেল (গজঞ) নেটওয়ার্কের নতুন লাইনগুলোর সম্প্রসারণে জাপান নিরবচ্ছিন্ন কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। নগর পরিবহন ব্যবস্থার এই যুগান্তকারী পরিবর্তন ঢাকার যানজট সমস্যা কমিয়ে এনে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মঘণ্টার অপচয় রোধ করছে।
একই সঙ্গে আধুনিক এভিয়েশন হাব হিসেবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক এয়ারলাইন্সগুলোর সংযোগস্থলে রূপান্তর করা সহজ হচ্ছে। জাপানের প্রস্তাবিত ৬৩০ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ সরাসরি দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বা ডাইরেক্ট এফডিআই (ঋউও) নিশ্চিত করবে। বৈশ্বিক সংকট ও ডলার টানাপোড়েনের এই সময়ে জাপানের মতো বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার থেকে আসা মূলধন বিনিয়োগ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখবে।
আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আস্থার এক অত্যন্ত ইতিবাচক সংকেত পাঠাবে। জাপানি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চমানের শিল্প প্রযুক্তি, উন্নত ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিকের মতো আধুনিক প্রযুক্তি বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হবে।
দেশীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের আন্তর্জাতিক মানে দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের তরুণ শ্রমশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা এবং বিশ্ব উৎপাদন শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়া সহজ হবে। আড়াইহাজারে অবস্থিত ‘জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ চালুর মাধ্যমে অটোমোবাইল, কেমিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স ও এগ্রো-প্রসেসিং খাতের বিশ্বমানের ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনে আকৃষ্ট করা সম্ভব হয়েছে।
এই নিবেদিত অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত শিল্পায়নে সহায়তা করছে এবং দেশীয় ছোট-মাঝারি সরবরাহকারী (ঝগঊ) প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সাব-কন্ট্রাক্টিং ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি করছে। শিল্পাঞ্চলের এই সাফল্য দেশের রপ্তানি ঝুড়িকে বৈচিত্র্যময় করতে বিশেষ সাহায্য করবে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সিংহভাগ তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। জাপানি বিনিয়োগের হাত ধরে কেমিক্যাল, যন্ত্রাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি করার আইনি ও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জাপান ও উন্নত দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি আয়ের উৎসকে বহুমুখী করা সম্ভব হবে, যা বৈশ্বিক যেকোনো একক বাজারের মন্দার ধাক্কা থেকে দেশকে সুরক্ষা দেবে। জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (ঊচঅ) কার্যকর করতে উভয় দেশ দ্বিপাক্ষিক শুল্ক কাঠামোর আধুনিকায়ন ও কর নীতি যৌক্তিকীকরণে কাজ করছে।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল রাখতে এই ধরনের দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি অত্যন্ত জরুরি। ইপিএ কার্যকর বাস্তবায়নের ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীদের জাপানের মতো উচ্চ মানসম্পন্ন বাজারে শুল্কহীন বা স্বল্প শুল্কে পণ্য ও সেবা রপ্তানির নতুন আইনি পথ উন্মুক্ত হচ্ছে। জাপানের সঙ্গে এই গভীর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশকে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে একটি নিরপেক্ষ ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করছে।
কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক বা ভূ-রাজনৈতিক ব্লকে যুক্ত না হয়ে বরং ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতি বজায় রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশ বজায় রাখছে, ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ তার এক চমৎকার প্রতিফলন। এটি আন্তর্জাতিক ম-লে বাংলাদেশের স্বাধীন নীতিগত অবস্থান ও ট্রাস্ট বৃদ্ধি করছে। দুই দেশের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সমন্বিত উদ্যোগের ফলে একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও টেকসই অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়িত হবে।




















